আগ্নেয়গিরির ভেতরে কী থাকে, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহল অনেক পুরোনো। বাইরে থেকে পাহাড়ের মতো দেখালেও এর ভেতর থাকে উত্তপ্ত শিলা, গ্যাস এবং ম্যাগমা। এছাড়া বিভিন্ন স্তরে থাকে কঠিন শিলা ও খনিজ পদার্থ। তবে আগ্নেয়গিরির গঠন সাধারণ পাহাড়ের চেয়ে অনেক আলাদা।

আগ্নেয়গিরি কী?
আগ্নেয়গিরি হলো পৃথিবীর ভূত্বকের একটি বিশেষ দুর্বল স্থান। এই স্থান দিয়ে ভূগর্ভের উত্তপ্ত পদার্থ বাইরে বেরিয়ে আসে। কখনো এটি শান্ত থাকে। আবার কখনো প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে লাভা, ছাই এবং গ্যাস ছড়িয়ে দেয়।
পৃথিবীর গভীরে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি। সেই তাপে কিছু শিলা গলে তরল অবস্থায় পরিণত হয়। এই গলিত শিলাকে বলা হয় ম্যাগমা।
ম্যাগমা যখন ভূগর্ভে থাকে, তখন সেটি ম্যাগমা নামেই পরিচিত। কিন্তু সেটি আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে বাইরে বের হলে তাকে লাভা বলা হয়।
আগ্নেয়গিরির ভেতরে ম্যাগমা থাকে
আগ্নেয়গিরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ম্যাগমা। এটি অত্যন্ত উত্তপ্ত গলিত শিলা।
ম্যাগমা সাধারণত পৃথিবীর ভূত্বকের নিচে জমা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি বিশাল ম্যাগমা কক্ষে জমে থাকে।
এই ম্যাগমার তাপমাত্রা অনেক বেশি হতে পারে। তাই এর আশপাশের শিলাও প্রচণ্ড উত্তপ্ত থাকে।
তবে সব ম্যাগমা একই ধরনের নয়। এর মধ্যে বিভিন্ন খনিজ এবং রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে।
ম্যাগমার ঘনত্ব এবং গঠন অনুযায়ী লাভার প্রবাহও পরিবর্তিত হয়।
ম্যাগমা চেম্বার কী?
আগ্নেয়গিরির নিচে ম্যাগমা জমে থাকার একটি অঞ্চলকে ম্যাগমা চেম্বার বলা হয়। এটি সাধারণত ভূগর্ভের অনেক গভীরে অবস্থান করে।
তবে সব আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা চেম্বার একই রকম নয়। কোথাও এটি বড় হতে পারে। আবার কোথাও ছোট বা জটিল আকারের হতে পারে।
ম্যাগমা চেম্বারে চাপ বাড়তে থাকলে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনা বাড়ে। তখন ম্যাগমা ফাটল দিয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে।
আগ্নেয়গিরির ভেতরে লাভা কীভাবে তৈরি হয়?
ম্যাগমা যখন পৃথিবীর পৃষ্ঠের দিকে উঠে আসে, তখন চাপ ধীরে ধীরে কমে। ফলে এর মধ্যে থাকা কিছু গ্যাস আলাদা হতে শুরু করে।
অবশেষে ম্যাগমা আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। তখন সেটি লাভা নামে পরিচিত হয়।
লাভা অত্যন্ত গরম থাকে। তাই এটি আশপাশের উদ্ভিদ, মাটি এবং বিভিন্ন বস্তু পুড়িয়ে দিতে পারে।
তবে লাভার গতি সবসময় একই থাকে না। এর রাসায়নিক গঠন এবং তাপমাত্রার ওপর গতি নির্ভর করে।
আগ্নেয়গিরির ভেতরে গ্যাসও থাকে
আগ্নেয়গিরির ভেতরে শুধু ম্যাগমা থাকে না। সেখানে বিভিন্ন ধরনের গ্যাসও থাকতে পারে।
জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং সালফারযুক্ত গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এছাড়া অল্প পরিমাণে অন্যান্য গ্যাসও থাকতে পারে।
ম্যাগমার মধ্যে এসব গ্যাস দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। চাপ কমলে গ্যাসগুলো আলাদা হয়ে বুদবুদের মতো তৈরি হয়।
এই গ্যাসের চাপ অগ্ন্যুৎপাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে আটকে থাকা গ্যাস হঠাৎ বের হলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
আগ্নেয়গিরির ভেতরের পাইপ বা নালি
ম্যাগমা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট পথ ধরে উপরের দিকে ওঠে। এই পথকে ম্যাগমা কনডুইট বা নালি বলা হয়।
এই নালির মাধ্যমে ম্যাগমা আগ্নেয়গিরির মুখের দিকে এগিয়ে যায়। কখনো এই পথ সরাসরি থাকে।
আবার কখনো ম্যাগমা বিভিন্ন ফাটল দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আগ্নেয়গিরির গঠন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
আগ্নেয়গিরির মুখে কী থাকে?
আগ্নেয়গিরির উপরের খোলা অংশকে ক্রেটার বলা হয়। অগ্ন্যুৎপাতের সময় এখান দিয়ে লাভা, ছাই এবং গ্যাস বের হতে পারে।
কিছু আগ্নেয়গিরির ক্রেটার অনেক বড় হয়। আবার কিছু আগ্নেয়গিরিতে ছোট মুখ দেখা যায়।
বড় অগ্ন্যুৎপাতের পরে ক্রেটারের আকার পরিবর্তিত হতে পারে। কখনো এর মধ্যে পানি জমে হ্রদও তৈরি হয়।
আগ্নেয়গিরির ভেতরে শক্ত শিলাও থাকে
আগ্নেয়গিরির চারপাশে এবং ভেতরে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয় শিলা তৈরি হয়। লাভা ঠান্ডা হলে ধীরে ধীরে শক্ত শিলায় পরিণত হয়।
ব্যাসল্ট এবং অ্যান্ডেসাইট এমন আগ্নেয় শিলার উদাহরণ। আবার কিছু আগ্নেয়গিরিতে রায়োলাইট ধরনের শিলাও পাওয়া যায়।
এভাবে বহু অগ্ন্যুৎপাতের পর আগ্নেয়গিরির শরীরে নতুন নতুন শিলার স্তর তৈরি হয়।
আগ্নেয়গিরির ভেতরে কেন এত তাপ?
পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড তাপ রয়েছে। এই তাপের প্রধান উৎস পৃথিবীর গঠনের সময় জমা হওয়া শক্তি এবং তেজস্ক্রিয় মৌলের ক্ষয়।
তাই গভীরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত তাপমাত্রা বাড়ে। কিছু অঞ্চলে এই তাপ শিলা গলানোর জন্য যথেষ্ট হয়।
ফলে সেখানে ম্যাগমা তৈরি হতে পারে। পরে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে সেই ম্যাগমা উপরে উঠতে পারে।
অগ্ন্যুৎপাতের সময় কী ঘটে?
ম্যাগমা যখন উপরের দিকে ওঠে, তখন এর ওপরের চাপ কমতে থাকে। ফলে ম্যাগমার গ্যাস প্রসারিত হয়।
এক পর্যায়ে চাপ আশপাশের শিলার শক্তিকে অতিক্রম করতে পারে। তখন ফাটল তৈরি হয়।
এরপর ম্যাগমা দ্রুত উপরে উঠে আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে বের হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অগ্ন্যুৎপাত শান্ত বা বিস্ফোরণধর্মী হতে পারে।
বিস্ফোরণধর্মী অগ্ন্যুৎপাতে ছাই, পাথরের টুকরো এবং গ্যাস অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়ে।
আগ্নেয়গিরির ভেতর কি খালি জায়গা থাকে?
অনেকে মনে করেন আগ্নেয়গিরির নিচে বিশাল খালি গর্ত থাকে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
ম্যাগমা চেম্বারকে সাধারণত বিশাল খালি গুহা হিসেবে ভাবা ঠিক নয়। সেখানে গলিত শিলার পাশাপাশি স্ফটিক ও কঠিন শিলাও থাকতে পারে।
অর্থাৎ এটি অনেক বেশি জটিল একটি ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থা। এর ভেতরে তরল, আধা-গলিত এবং কঠিন পদার্থ একসঙ্গে থাকতে পারে।
অগ্ন্যুৎপাতের পরে ভেতরে কী হয়?
অগ্ন্যুৎপাতের পর আগ্নেয়গিরির ভেতরের চাপ কমতে পারে। কিছু ম্যাগমা ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে যায়।
তবে নিচে থাকা ম্যাগমা আবার নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে একই আগ্নেয়গিরি আবার সক্রিয় হতে পারে।
কখনো দীর্ঘ সময় ধরে আগ্নেয়গিরি শান্ত থাকে। তবুও সেটি পুরোপুরি মৃত নয়।
আগ্নেয়গিরি পৃথিবীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আগ্নেয়গিরি শুধু ধ্বংস সৃষ্টি করে না। এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে পৃথিবীর গভীর অংশের পদার্থ পৃষ্ঠে আসে। সেই পদার্থ থেকে নতুন শিলা এবং নতুন ভূমি তৈরি হতে পারে।
আবার আগ্নেয় ছাই মাটিতে বিভিন্ন খনিজ যোগ করতে পারে। ফলে কিছু অঞ্চলের মাটি কৃষির জন্য অত্যন্ত উর্বর হয়।
এছাড়া আগ্নেয়গিরি পৃথিবীর অভ্যন্তরের কার্যকলাপ বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে, আগ্নেয়গিরির ভেতরে কী থাকে তার উত্তর বেশ বিস্ময়কর। সেখানে থাকে ম্যাগমা, গ্যাস, উত্তপ্ত শিলা এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থ।
এর নিচে ম্যাগমা জমতে পারে। এরপর চাপ বাড়লে ম্যাগমা ফাটল দিয়ে উপরে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এটি লাভা, গ্যাস এবং ছাই হিসেবে বাইরে বেরিয়ে আসে। তাই আগ্নেয়গিরি আসলে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ শক্তির একটি প্রাকৃতিক জানালা।




