গ্রহকে নক্ষত্র বলা যায় না কেন?

আকাশের দিকে তাকালে গ্রহ ও নক্ষত্র দুটিকেই উজ্জ্বল দেখা যায়। তবে গ্রহ ও নক্ষত্র এক ধরনের জ্যোতিষ্ক নয়। তাদের গঠন, আলো এবং কাজের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই গ্রহকে নক্ষত্র বলা যায় না।

গ্রহকে নক্ষত্র বলা যায় না কেন?

গ্রহ ও নক্ষত্রের মধ্যে পার্থক্য

নক্ষত্র হলো এমন মহাজাগতিক বস্তু, যা নিজেই আলো ও তাপ তৈরি করে। সূর্য আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র। সূর্যের ভেতরে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর শক্তি তৈরি হয়। ফলে সূর্য নিজে আলো ছড়ায়।

অন্যদিকে, গ্রহ নিজের আলো তৈরি করতে পারে না। গ্রহ নক্ষত্রের আলো প্রতিফলিত করে উজ্জ্বল দেখায়। পৃথিবীও এমন একটি গ্রহ। পৃথিবী সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। তাই রাতের আকাশে পৃথিবী থেকে অন্য গ্রহগুলো দেখা যায়।

নক্ষত্র নিজে আলো দেয়

নক্ষত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নিজস্ব আলো। নক্ষত্রের কেন্দ্রে প্রচণ্ড তাপ ও চাপ থাকে। সেখানে পারমাণবিক সংযোজন বিক্রিয়া ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়।

এই শক্তি আলো ও তাপ হিসেবে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। তাই নক্ষত্রকে দূর থেকে উজ্জ্বল বিন্দুর মতো দেখা যায়।

সূর্যও একটি নক্ষত্র। তবে এটি পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে কাছে। তাই অন্যান্য নক্ষত্রের চেয়ে সূর্যকে অনেক বড় এবং উজ্জ্বল মনে হয়।

গ্রহ নিজে আলো তৈরি করে না

গ্রহ নক্ষত্রের মতো নিজস্ব আলো তৈরি করে না। বরং নক্ষত্রের আলো তার পৃষ্ঠে পড়ে। সেই আলো কিছুটা প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়।

উদাহরণ হিসেবে পৃথিবীকে ধরা যায়। পৃথিবী নিজে সূর্যের মতো আলো তৈরি করে না। সূর্যের আলো পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে পড়ে। সেই আলো প্রতিফলিত হয়।

শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনি একইভাবে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে।

গ্রহ কেন নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে?

রাতের আকাশে অনেক গ্রহকে উজ্জ্বল দেখা যায়। তাই অনেক সময় গ্রহকে নক্ষত্র মনে হতে পারে। তবে তাদের আলো আসলে আলাদা উৎস থেকে আসে।

গ্রহের উজ্জ্বলতা মূলত নক্ষত্রের আলো প্রতিফলনের কারণে হয়। গ্রহ যত বেশি আলো প্রতিফলিত করতে পারে, তাকে তত উজ্জ্বল দেখা যেতে পারে।

তবে গ্রহের আলো সাধারণত নক্ষত্রের মতো নিজস্ব নয়। এ কারণেই গ্রহকে নক্ষত্র বলা যায় না।

গ্রহ ও নক্ষত্রের গঠন

গ্রহ এবং নক্ষত্রের গঠনও এক নয়। নক্ষত্র সাধারণত প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে গঠিত। এর কেন্দ্রে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা থাকে।

অন্যদিকে, সব গ্রহের গঠন একই নয়। পৃথিবীর মতো গ্রহ প্রধানত পাথর ও ধাতু দিয়ে তৈরি। আবার বৃহস্পতি ও শনির মতো গ্রহে প্রচুর গ্যাস রয়েছে।

অতএব, গ্রহের গঠন নক্ষত্রের গঠন থেকে আলাদা।

গ্রহ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে

গ্রহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কক্ষপথ। গ্রহ সাধারণত একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে।

আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। পৃথিবীও সূর্যের চারদিকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।

অন্যদিকে, সূর্য নিজেই একটি নক্ষত্র। এটি সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

নক্ষত্রের নিজস্ব শক্তির উৎস রয়েছে

নক্ষত্রের অভ্যন্তরে পারমাণবিক সংযোজনের মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয়। এই শক্তিই নক্ষত্রকে আলো ও তাপ দেওয়ার ক্ষমতা দেয়।

গ্রহের ক্ষেত্রে এমন প্রক্রিয়া ঘটে না। তাই গ্রহ সূর্যের মতো নিজস্ব আলো ও তাপ তৈরি করতে পারে না।

এই কারণেই গ্রহকে নক্ষত্রের সঙ্গে একই শ্রেণিতে রাখা যায় না।

গ্রহকে নক্ষত্র বলা যায় না কেন?

সহজভাবে বললে, গ্রহকে নক্ষত্র বলা যায় না কয়েকটি কারণে।

প্রথমত, নক্ষত্র নিজস্ব আলো ও তাপ উৎপন্ন করে। গ্রহ তা পারে না।

দ্বিতীয়ত, নক্ষত্রের কেন্দ্রে পারমাণবিক সংযোজন ঘটে। গ্রহে এমন নক্ষত্রসুলভ সংযোজন ঘটে না।

তৃতীয়ত, গ্রহ সাধারণত নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘোরে। নক্ষত্র নিজেই একটি নক্ষত্রমণ্ডল বা গ্রহব্যবস্থার কেন্দ্র হতে পারে।

চতুর্থত, গ্রহ ও নক্ষত্রের ভর, আকার এবং অভ্যন্তরীণ গঠনেও বড় পার্থক্য রয়েছে।

পৃথিবী কি নক্ষত্র হতে পারে?

পৃথিবী একটি গ্রহ। এটি কখনো স্বাভাবিকভাবে সূর্যের মতো নক্ষত্র হয়ে উঠবে না। নক্ষত্র হওয়ার জন্য অত্যন্ত বেশি ভর এবং কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় চাপ দরকার।

পৃথিবীর ভর নক্ষত্র হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই পৃথিবী নিজে আলো উৎপন্নকারী নক্ষত্রে পরিণত হতে পারে না।

সহজ উদাহরণ

বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদের কথা ভাবুন।

সূর্য নিজে আলো দেয়। তাই সূর্য নক্ষত্র।

পৃথিবী সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। তাই পৃথিবী গ্রহ।

চাঁদও নিজস্ব আলো তৈরি করে না। এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। তবে চাঁদ গ্রহ নয়। এটি পৃথিবীর প্রাকৃতিক উপগ্রহ।

এভাবে দেখলে গ্রহ, নক্ষত্র এবং উপগ্রহের পার্থক্য সহজে বোঝা যায়।

শেষ কথা

গ্রহ ও নক্ষত্র দুটিই মহাকাশের গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতিষ্ক। তবে তাদের বৈশিষ্ট্য এক নয়। গ্রহ নিজস্ব আলো তৈরি করে না। নক্ষত্র নিজেই আলো ও তাপ উৎপন্ন করে। গ্রহ সাধারণত নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে।

তাই আকাশে কোনো গ্রহকে উজ্জ্বল দেখালেও তাকে নক্ষত্র বলা যায় না। বরং আলো কোথা থেকে আসছে এবং জ্যোতিষ্কটি কীভাবে চলাচল করছে, সেটিই তাদের পরিচয় বুঝতে সাহায্য করে।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading