খাবার হজম হয় কীভাবে? জানুন সহজভাবে

আমরা প্রতিদিন নানা ধরনের খাবার খাই। কিন্তু খাবার হজম হয় কীভাবে, তা অনেকেই জানি না। খাবার মুখে দেওয়ার পর থেকেই হজমের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর খাবার পাকস্থলী ও অন্ত্রের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে। শরীর তখন খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে। অবশেষে অপ্রয়োজনীয় অংশ শরীর থেকে বের হয়ে যায়।

মুখ থেকেই হজম শুরু হয়

খাবার মুখে দেওয়ার পর দাঁত সেটিকে ছোট ছোট টুকরো করে। এরপর জিহ্বা খাবারের সঙ্গে লালা মেশাতে সাহায্য করে।

লালার মধ্যে কিছু এনজাইম থাকে। এগুলো খাবারের নির্দিষ্ট উপাদান ভাঙার কাজ শুরু করে। তাই খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

চিবানোর পর খাবার নরম একটি বলের মতো হয়। তারপর জিহ্বা সেটিকে গলার দিকে ঠেলে দেয়।

খাবার কীভাবে পাকস্থলীতে যায়?

গিলে ফেলার পর খাবার সরাসরি পাকস্থলীতে পড়ে না। এটি খাদ্যনালি দিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছায়।

খাদ্যনালির পেশি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়। এই সংকোচনের ফলে খাবার নিচের দিকে এগিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে পেরিস্টালসিস বলা হয়।

ফলে আমরা শুয়ে থাকলেও খাবার পাকস্থলীতে পৌঁছাতে পারে।

পাকস্থলীতে কী ঘটে?

পাকস্থলী খাবার কিছু সময় ধরে জমা রাখে। একই সঙ্গে পাকস্থলীর পেশি খাবারকে নাড়াচাড়া করে।

এখানে পাকস্থলীর অ্যাসিড এবং বিভিন্ন হজমকারী উপাদান কাজ করে। এগুলো খাবারকে আরও ভেঙে নরম তরলে পরিণত করতে সাহায্য করে।

বিশেষ করে প্রোটিন হজমের ক্ষেত্রে পাকস্থলীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তবে পাকস্থলীর অ্যাসিড শক্তিশালী হলেও পাকস্থলীর নিজস্ব আবরণ তাকে সুরক্ষা দেয়।

এরপর খাবার যায় ক্ষুদ্রান্ত্রে

পাকস্থলী থেকে আংশিক হজম হওয়া খাবার ধীরে ধীরে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করে। খাবার হজমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি এখানে ঘটে।

ক্ষুদ্রান্ত্রে অগ্ন্যাশয় এবং যকৃতের তৈরি বিভিন্ন উপাদান হজমে সাহায্য করে।

অগ্ন্যাশয় থেকে আসা এনজাইম কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও চর্বি ভাঙতে সাহায্য করে। অন্যদিকে যকৃতের তৈরি পিত্তরস চর্বি হজমে সহায়তা করে।

পুষ্টি শরীরে কীভাবে শোষিত হয়?

ক্ষুদ্রান্ত্রের ভেতরের দেয়ালে অসংখ্য ক্ষুদ্র আঙুলের মতো গঠন রয়েছে। এগুলোকে ভিলাই বলা হয়।

ভিলাইয়ের মাধ্যমে খাবার থেকে তৈরি হওয়া পুষ্টি রক্তে শোষিত হয়। এরপর রক্ত সেগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেয়।

এভাবেই খাবার থেকে পাওয়া শক্তি এবং পুষ্টি শরীরের কাজে লাগে।

বৃহদান্ত্রের কাজ কী?

ক্ষুদ্রান্ত্রে পুষ্টি শোষণের পর অবশিষ্ট অংশ বৃহদান্ত্রে যায়। এখানে মূলত পানি এবং কিছু লবণ শোষিত হয়।

এরপর অবশিষ্ট উপাদান ধীরে ধীরে মল হিসেবে জমা হয়। পরে শরীর মলত্যাগের মাধ্যমে সেটি বের করে দেয়।

খাবার হজম হতে কত সময় লাগে?

খাবার হজম হতে নির্দিষ্ট একটি সময় লাগে না। খাবারের ধরন, পরিমাণ এবং ব্যক্তির শরীরের ওপর সময় নির্ভর করে।

তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার তুলনামূলক বেশি সময় নিতে পারে। অন্যদিকে কিছু সহজপাচ্য খাবার দ্রুত পাকস্থলী থেকে বের হতে পারে।

এছাড়া বয়স, শারীরিক কার্যকলাপ এবং হজমশক্তিও এতে প্রভাব ফেলতে পারে।

হজম ভালো রাখতে কী করবেন?

হজমশক্তি ভালো রাখতে কিছু সহজ অভ্যাস অনুসরণ করা যায়।

  • খাবার ধীরে ধীরে এবং ভালোভাবে চিবিয়ে খান।
  • অতিরিক্ত খাবার একসঙ্গে খাবেন না।
  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
  • শাকসবজি ও ফলমূল খাবারে রাখুন।
  • অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার কমান।
  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন।
  • খাবারের পরপরই অতিরিক্ত ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন।

হজমের সমস্যা হলে কী করবেন?

মাঝেমধ্যে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। তবে এসব সমস্যা বারবার হলে কারণ খুঁজে দেখা দরকার।

তীব্র পেটব্যথা, দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা, রক্তপাত বা অস্বাভাবিক ওজন কমার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শেষ কথা

খাবার হজম হয় কীভাবে জানতে গেলে পুরো হজমতন্ত্রকে বুঝতে হয়। মুখে চিবানোর মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। এরপর খাদ্যনালি, পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্র বিভিন্নভাবে কাজ করে।

শেষ পর্যন্ত শরীর খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করে। অপ্রয়োজনীয় অংশ বৃহদান্ত্রে যায় এবং পরে শরীর থেকে বের হয়ে যায়।

অর্থাৎ, আমরা যে খাবার খাই, সেটিকে শরীর ব্যবহারযোগ্য পুষ্টিতে পরিণত করার একটি চমৎকার প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই হলো হজম প্রক্রিয়া।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading