গল্পঃ ভয়ঙ্কর আমাজনের অভি্যাত্রী আরিয়ান এবং ইরা

E-Book Series – Published on Amazon KDP

পর্ব ১: কুয়াশার চাদরে মায়াবী আহ্বান

    আমাজনের গহীন অরণ্য যখন ভোরের আলোয় চোখ মেলে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা যেন লক্ষ বছর পিছিয়ে গেছে। চারিদিকে সবুজের এমন গাঢ় আস্তরণ, যা ভেদ করে সূর্যের আলো পৌঁছাতেও হিমশিম খায়। আর সেই ঘন জঙ্গলের বুক চিরে বয়ে চলা শান্ত নদীটি এখন কুয়াশার সাদা চাদরে ঢাকা।

    নৌকার একদম সামনে বসে ছিল আরিয়ান। তার কাঁধে ঝুলছে দামী ডিএসএলআর ক্যামেরা। গত দুই বছর ধরে সে এই মুহূর্তটির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তার পাশেই বসে ইরা, তার হাতে একটি নীল রঙের ডায়েরি। সে পেশায় একজন নৃবিজ্ঞানী, কিন্তু আমাজনের প্রতি তার টান চিরকালের। তাদের গাইড রদ্রিগো নৌকার হাল ধরে আছে। স্থানীয় মানুষ রদ্রিগো এই নদী আর জঙ্গলকে নিজের হাতের তালুর মতো চেনে।

    রদ্রিগো বৈঠার শব্দ থামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “শুনতে পাচ্ছো? এটা আমাজনের গান।”

    আরিয়ান কান পাতল। জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে নাম না জানা হাজারো পাখির ডাক, ডালপালার মড়মড় শব্দ আর পানির হালকা কলতান। সে তার ক্যামেরা বের করে লেন্সটা সেট করল। কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের প্রথম রশ্মি যখন পানির ওপর পড়ল, তখন মনে হলো কেউ যেন নদীতে গলানো সোনা ঢেলে দিয়েছে।

    ইরা তার ডায়েরিতে দ্রুত কলম চালাচ্ছে। সে লিখল— “আজকের অ্যামাজনের সকালটা যেন এক জীবন্ত স্বপ্ন। চারপাশের এই নিস্তব্ধতা যতটা শান্তির, তার চেয়েও বেশি রহস্যময়।”

    গোলাপি ডলফিনের নৃত্য

    হঠাৎ নৌকার ডান পাশে পানির নিচে একটা বিশাল ছায়া দেখা গেল। শান্ত নদীটা মুহূর্তেই অশান্ত হয়ে উঠল। ইরা চিৎকার করে উঠল, “আরিয়ান, ওটা কী?”

    পানির ওপর একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেসে উঠল একদল গোলাপি অ্যামাজন ডলফিন! তাদের গায়ের রং ভোরের আকাশের মতো হালকা গোলাপি। পানির নিচ থেকে লাফিয়ে উঠে তারা যেন আরিয়ান আর ইরাকে অভিবাদন জানাচ্ছিল।

    “দেখো, দেখো! এরা সত্যিই আছে!” আরিয়ান উত্তেজনায় নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ক্যামেরার শাটার দ্রুত শব্দে ক্লিক করতে লাগল।

    ডলফিনগুলো নৌকার এত কাছে চলে এল যে, তাদের লাফালাফি আর লেজের ঝাপটায় নৌকার সবাই ভিজে একাকার হয়ে গেল। ইরা হাততালি দিয়ে বলল, “কী সুন্দর! মনে হচ্ছে আমাদের জন্য নাচছে ওরা।”

    রদ্রিগোর মুখে চওড়া হাসি। সে বলল, “এরা শুভ লক্ষণ। আমাজনের এই গোলাপি ডলফিন বা ‘বোতো’ দেখা মানে তোমাদের যাত্রা সৌভাগ্যে ভরা হবে। এখানকার আদিবাসীরা বিশ্বাস করে, এরা জঙ্গলের রক্ষক।”

    প্রায় দশ মিনিট ধরে ডলফিনগুলো তাদের সঙ্গ দিল। তারপর হঠাৎ করেই যেমন এসেছিল, তেমনই বনের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। চারিদিক আবার নিঝুম হয়ে এল। কিন্তু আরিয়ান আর ইরার মনের ভেতর তখনো সেই রোমাঞ্চ কাজ করছিল।

    রোমাঞ্চের শুরু

    বেলা বাড়ার সাথে সাথে কুয়াশা কাটতে শুরু করল। রদ্রিগো এবার নৌকার গতি কিছুটা বাড়াল। নদীর মুখটা ধীরে ধীরে সরু হয়ে আসছে, আর দুই পাশের গাছগুলো যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে।

    হঠাৎ রদ্রিগোর চোখের চাউনি বদলে গেল। সে নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল।

    আরিয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হলো রদ্রিগো? থামলে কেন?”

    রদ্রিগো কোনো কথা না বলে আঙুল দিয়ে নদীর পাড়ে কাদা মাটির দিকে ইশারা করল। সেখানে কোনো বড় প্রাণীর পায়ের ছাপ নয়, বরং তীরের বালিতে পড়ে আছে একটি অদ্ভুত কারুকাজ করা পাথরের খণ্ড। পাথরটি থেকে হালকা নীলচে আভা বের হচ্ছে, যা এই গহীন জঙ্গলে একেবারেই বেমানান।

    রদ্রিগো গম্ভীর গলায় বলল, “এটা সাধারণ কোনো পাথর নয়। এটা ‘সোনালি শহরের’ সীমানা চিহ্ন। ডলফিনগুলো আমাদের আশীর্বাদ দিলেও, জঙ্গল হয়তো আমাদের অন্য কিছু বলতে চাইছে।”

    ইরা পাথরটির দিকে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল, কিন্তু রদ্রিগো বাধা দিয়ে বলল, “এখন না। আমরা এমন এক জায়গায় ঢুকে পড়েছি যেখান থেকে ফিরে আসার পথ খুব কম মানুষই জানে।”

    আরিয়ান আর ইরা একে অপরের দিকে তাকালো। ভোরের সেই শান্ত সৌন্দর্য মুহূর্তেই এক অজানা আশঙ্কায় রূপ নিল। তারা বুঝতে পারল, রোমাঞ্চকর এই অভিযানের মাত্র শুরু হলো, আর সামনে অপেক্ষা করছে ভয়ঙ্কর কোনো রহস্য।


    প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

    পরবর্তী পর্বে থাকছে: জলার বনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাবে তাদের একজন। আরিয়ান আর ইরা কি পারবে আমাজনের সেই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে?

    Leave a Reply

    Scroll to Top

    Discover more from BR Creatives

    Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

    Continue reading