তারা কি? তারা ও নক্ষত্রের মধ্যে পার্থক্য

তারা কি—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, রাতের আকাশে যে ছোট ছোট আলোর বিন্দু দেখা যায়, সেগুলোর অধিকাংশই দূরের নক্ষত্র। পৃথিবী থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে নক্ষত্রগুলো আমাদের চোখে ছোট আলোর বিন্দুর মতো মনে হয়। আসলে প্রতিটি নক্ষত্রই বিশাল আকারের উত্তপ্ত গ্যাসের গোলক।

তারা কি

তারা কি?

সাধারণ ভাষায় আকাশে দেখা উজ্জ্বল নক্ষত্রকে আমরা তারা বলি। অর্থাৎ তারা কোনো আলাদা মহাজাগতিক বস্তুর নাম নয়। বাংলায় নক্ষত্রকে সাধারণভাবে তারা বলা হয়।

নক্ষত্র নিজের আলো ও তাপ তৈরি করে। এর কেন্দ্রে পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। সেই শক্তি আলো ও তাপ হিসেবে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।

তাই রাতের আকাশে আমরা যে অসংখ্য তারা দেখি, সেগুলোর বেশিরভাগই আসলে দূরের নক্ষত্র।

তারা দেখতে ছোট কেন?

তারা আসলে ছোট নয়। অনেক নক্ষত্রের আকার সূর্যের চেয়েও বহু গুণ বড় হতে পারে।

তবে পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব অত্যন্ত বেশি। তাই বিশাল নক্ষত্রও আমাদের চোখে ছোট আলোর বিন্দু হিসেবে দেখা যায়।

উদাহরণ হিসেবে সূর্যও একটি নক্ষত্র। কিন্তু সূর্য পৃথিবীর তুলনামূলক কাছে। তাই সূর্যকে আকাশে অনেক বড় দেখায়।

সূর্য কি তারা?

হ্যাঁ, সূর্য একটি তারা বা নক্ষত্র। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র।

সূর্যের আলো ও তাপ পৃথিবীতে পৌঁছায়। পৃথিবীর জীবজগতের জন্য সূর্যের শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূর্যকে দিনের আকাশে বড় দেখানোর কারণ এর আকার নয়। মূল কারণ হলো এটি অন্যান্য নক্ষত্রের তুলনায় পৃথিবীর অনেক কাছে।

তারা কীভাবে আলো দেয়?

তারার কেন্দ্রে অত্যন্ত বেশি তাপমাত্রা ও চাপ থাকে। সেখানে হাইড্রোজেন পরমাণু একত্রিত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে।

এই প্রক্রিয়াকে নিউক্লীয় ফিউশন বা পারমাণবিক সংযোজন বলা হয়। এর ফলে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়।

এই শক্তি ধীরে ধীরে তারার বাইরের স্তরে পৌঁছে মহাকাশে আলো ও তাপ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।

সব তারা কি একই রকম?

না, সব তারা এক রকম নয়। তাদের আকার, তাপমাত্রা, রং, ভর এবং বয়স ভিন্ন হতে পারে।

কিছু তারা সূর্যের চেয়ে ছোট। আবার কিছু তারা সূর্যের চেয়ে শত শত গুণ বড় হতে পারে।

কিছু তারা নীল বা সাদা দেখায়। আবার কিছু তারা হলুদ, কমলা বা লালচে দেখাতে পারে।

তারার রং কেন আলাদা?

তারার রং মূলত তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সাধারণভাবে বেশি উত্তপ্ত তারা নীলাভ বা সাদাটে দেখায়। তুলনামূলক কম উত্তপ্ত তারা কমলা বা লালচে দেখাতে পারে।

সূর্যকে পৃথিবী থেকে হলুদাভ দেখালেও এর প্রকৃত আলো বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমন্বয়ে তৈরি।

তারা কি টিমটিম করে?

হ্যাঁ, পৃথিবী থেকে অনেক তারাকে টিমটিম করতে দেখা যায়। এর প্রধান কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল।

তারার আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে আসার সময় বারবার সামান্য পরিবর্তিত হয়। ফলে তারার উজ্জ্বলতা আমাদের চোখে ওঠানামা করছে বলে মনে হয়।

তবে মহাকাশ থেকে দেখলে তারার আলো এভাবে টিমটিম করে না।

তারা ও গ্রহের মধ্যে পার্থক্য

তারা এবং গ্রহ এক নয়। তারা নিজের আলো ও তাপ তৈরি করে। অন্যদিকে গ্রহ সাধারণত নিজের আলো তৈরি করে না।

গ্রহ কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ করে। পৃথিবী যেমন সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে।

আকাশে কিছু গ্রহও উজ্জ্বল দেখায়। তবে তাদের আলো মূলত সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ার কারণে দেখা যায়।

রাতের আকাশে এত তারা দেখা যায় কেন?

আমাদের গ্যালাক্সি আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়েতে অসংখ্য নক্ষত্র রয়েছে। এর বাইরে আরও অসংখ্য গ্যালাক্সি রয়েছে।

পৃথিবী থেকে পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকালে আমাদের চোখে অনেক দূরের নক্ষত্রের আলো পৌঁছায়।

শহরের কৃত্রিম আলো কম থাকলে সাধারণত আরও বেশি তারা দেখা যায়।

তারা কত দূরে থাকে?

তারাগুলো পৃথিবী থেকে অত্যন্ত দূরে থাকে। তাই তাদের দূরত্ব সাধারণত কিলোমিটারে প্রকাশ করা সুবিধাজনক নয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তারার দূরত্ব বোঝাতে আলোকবর্ষ ব্যবহার করেন।

এক আলোকবর্ষ হলো আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে। এটি প্রায় ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটারের সমান।

পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের তারা কোনটি?

সূর্য পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের তারা। সূর্যের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের পরিচিত নক্ষত্র হলো প্রক্সিমা সেন্টরি।

এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। এত দূরে থাকার কারণে খালি চোখে এটি সহজে দেখা যায় না।

তারা কীভাবে জন্মায়?

তারার জন্ম হয় মহাকাশে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল মেঘ থেকে। এই মেঘকে নেবুলা বলা হয়।

মহাকর্ষের প্রভাবে গ্যাস ও ধূলিকণা একত্রিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে কেন্দ্রে চাপ ও তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।

এক পর্যায়ে কেন্দ্রে নিউক্লীয় ফিউশন শুরু হলে নতুন তারার জন্ম হয়।

তারার কি মৃত্যু হয়?

হ্যাঁ, তারারও একটি জীবনচক্র রয়েছে। তবে সব তারার শেষ পরিণতি একই নয়।

সূর্যের মতো মাঝারি ভরের তারা এক পর্যায়ে লাল দানবে পরিণত হতে পারে। পরে এর বাইরের স্তর ছড়িয়ে পড়ে এবং কেন্দ্রে সাদা বামন তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে অত্যন্ত বড় তারা সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে তাদের জীবন শেষ করতে পারে।

তারা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

তারা শুধু রাতের আকাশকে সুন্দর করে না। মহাবিশ্বের গঠন ও বিবর্তন বুঝতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ।

তারার ভেতরে বিভিন্ন মৌল তৈরি হতে পারে। পরে এসব মৌল মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।

গ্রহ, উপগ্রহ এবং অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর গঠনের সঙ্গে তারার উপাদানের সম্পর্ক রয়েছে।

তারা কি নড়াচড়া করে?

তারা মহাকাশে স্থির নয়। তারাগুলোও গ্যালাক্সির মধ্যে গতিশীল।

তবে পৃথিবী থেকে তাদের অনেক দূরে থাকার কারণে তাদের এই গতিবিধি খালি চোখে বোঝা যায় না।

রাতের আকাশে তারাদের অবস্থানও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। পৃথিবীর নিজস্ব আবর্তন ও পরিক্রমণের কারণেও তাদের অবস্থান আমাদের কাছে বদলে যেতে দেখা যায়।

তারা নিয়ে মানুষের আগ্রহ

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ রাতের আকাশের তারা পর্যবেক্ষণ করেছে। নাবিকরা সমুদ্রযাত্রায় তারার অবস্থান ব্যবহার করতেন।

বিভিন্ন সভ্যতা তারাদের নিয়ে নক্ষত্রমণ্ডল তৈরি করেছে। এসব নক্ষত্রমণ্ডল মানুষের সংস্কৃতি, গল্প ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

বর্তমানে আধুনিক টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা তারাদের আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

শেষ কথা

তারা বলতে সাধারণভাবে রাতের আকাশে দেখা নক্ষত্রকে বোঝায়। পৃথিবী থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে বিশাল নক্ষত্রগুলো আমাদের চোখে ছোট আলোর বিন্দুর মতো দেখায়।

সূর্যও একটি তারা। তবে পৃথিবীর কাছাকাছি থাকার কারণে সূর্যকে অন্য তারার তুলনায় অনেক বড় ও উজ্জ্বল দেখা যায়।

তারা কীভাবে জন্মায়, কীভাবে আলো তৈরি করে এবং কীভাবে তাদের জীবন শেষ হয়, তা জানা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading