পৃথিবীর গভীরে মাটির নিচে কী আছে?

পৃথিবীর গভীরে মাটির নিচে কী আছে, এই প্রশ্ন মানুষের কৌতূহল বহুদিনের। আমরা সাধারণত পৃথিবীর ওপরের অংশই দেখি। কিন্তু পায়ের নিচে রয়েছে বিশাল এক অদৃশ্য জগৎ।

সেখানে আছে মাটি, পাথর, খনিজ এবং প্রচণ্ড উত্তপ্ত পদার্থ। আরও গভীরে গেলে পরিবেশ ধীরে ধীরে বদলে যায়। তাপমাত্রা ও চাপও অনেক বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা সরাসরি সেখানে যেতে না পারলেও নানা গবেষণার মাধ্যমে এর গঠন সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন।

The current image has no alternative text. The file name is: পৃথিবীর-গভীরে.png

মাটির ওপরের স্তর

পৃথিবীর সবচেয়ে ওপরের অংশে রয়েছে মাটি। এই মাটিতেই গাছের শিকড় ছড়িয়ে থাকে। বিভিন্ন পোকামাকড়, কেঁচো এবং অণুজীবও এখানে বাস করে।

মাটির নিচে একটু গভীরে গেলেই শক্ত পাথরের স্তর পাওয়া যায়। তবে সব জায়গায় এই স্তরের গভীরতা এক নয়। কোথাও এটি পাতলা। আবার কোথাও বেশ পুরু।

ভূত্বক কী?

মাটির নিচে পৃথিবীর প্রথম প্রধান স্তর হলো ভূত্বক। এটিই পৃথিবীর বাইরের শক্ত আবরণ।

মহাদেশের নিচে ভূত্বক সাধারণত তুলনামূলকভাবে পুরু। অন্যদিকে, সমুদ্রের নিচে এর পুরুত্ব কম।

ভূত্বক বিভিন্ন ধরনের পাথর ও খনিজ দিয়ে তৈরি। মানুষ, গাছপালা এবং অধিকাংশ স্থলজ প্রাণীর জীবন এই স্তরের ওপর নির্ভরশীল।

ম্যান্টল বা আবরণী স্তর

ভূত্বকের নিচে রয়েছে ম্যান্টল। পৃথিবীর অভ্যন্তরের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এই স্তর।

ম্যান্টল মূলত কঠিন শিলা দিয়ে গঠিত। তবে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের কারণে এর গভীর অংশের শিলা খুব ধীরে প্রবাহিত হতে পারে।

এই ধীর গতির প্রবাহ পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্লেটের চলাচল এবং আগ্নেয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

উপরের ম্যান্টল

ম্যান্টলের ওপরের অংশকে বলা হয় উপরের ম্যান্টল। এর কিছু অংশ বেশ শক্ত। আবার কিছু অংশ দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে বিকৃত হতে পারে।

এই স্তরের পদার্থের চলাচল পৃথিবীর ওপরের শক্ত প্লেটগুলোর গতিবিধিতে প্রভাব ফেলে। ফলে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

নিচের ম্যান্টল

উপরের ম্যান্টলের নিচে রয়েছে নিচের ম্যান্টল। এখানে চাপ ও তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি।

তবুও প্রচণ্ড চাপের কারণে এখানকার শিলা পুরোপুরি তরল হয়ে যায় না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে খুব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।

এই স্তর পৃথিবীর ভেতরের তাপ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।

বহিঃকেন্দ্র

ম্যান্টলের নিচে রয়েছে পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্র। এটি মূলত তরল লোহা ও নিকেল দিয়ে গঠিত।

এই অঞ্চলের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানকার ধাতব পদার্থ তরল অবস্থায় থাকে।

তরল লোহা ও নিকেলের চলাচলের ফলে বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অন্তঃকেন্দ্র

পৃথিবীর একেবারে মাঝখানে রয়েছে অন্তঃকেন্দ্র। এটি প্রধানত লোহা ও নিকেল সমৃদ্ধ।

এখানকার তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি। তবুও প্রচণ্ড চাপের কারণে অন্তঃকেন্দ্র মূলত কঠিন অবস্থায় রয়েছে।

অর্থাৎ, পৃথিবীর কেন্দ্র অত্যন্ত গরম হলেও সেখানে শক্ত ধাতব পদার্থ থাকতে পারে। এটি পৃথিবীর অভ্যন্তরের অন্যতম বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য।

পৃথিবীর স্তরগুলো এক নজরে

পৃথিবীর অভ্যন্তরকে সাধারণভাবে চারটি প্রধান স্তরে ভাগ করা হয়।

স্তরপ্রধান বৈশিষ্ট্য
ভূত্বকপৃথিবীর বাইরের শক্ত স্তর
ম্যান্টলবিশাল পাথুরে স্তর
বহিঃকেন্দ্রতরল লোহা ও নিকেলের স্তর
অন্তঃকেন্দ্রপ্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকা কঠিন ধাতব অংশ

পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত গড় দূরত্ব প্রায় ৬,৩৭১ কিলোমিটার। মানুষ এখনো সরাসরি পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি।

তাই বিজ্ঞানীরা অন্য উপায়ে পৃথিবীর ভেতরের তথ্য সংগ্রহ করেন। বিশেষ করে ভূমিকম্পের তরঙ্গ তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে ভিন্নভাবে চলাচল করে। সেই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন সম্পর্কে ধারণা পান।

পৃথিবীর গভীরে তাপ এত বেশি কেন?

পৃথিবীর ভেতরের প্রচণ্ড তাপের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। পৃথিবী গঠনের সময় তৈরি হওয়া তাপের কিছু অংশ এখনো ভেতরে রয়ে গেছে।

এছাড়া, পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা কিছু তেজস্ক্রিয় মৌলের ক্ষয়ের সময় তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপও পৃথিবীর ভেতরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

গভীরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপও দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে পৃথিবীর ভেতরের পদার্থের আচরণ ওপরের অংশের তুলনায় অনেক আলাদা হয়।

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর গভীরতা সম্পর্কে জানেন কীভাবে?

পৃথিবীর কেন্দ্র সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীরা সরাসরি সেখানে যেতে পারেন না। তবে প্রকৃতি নিজেই তাদের অনেক তথ্য দেয়।

ভূমিকম্পের সময় উৎপন্ন তরঙ্গ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা সেই তরঙ্গের গতি ও দিক বিশ্লেষণ করেন।

আবার আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে গভীর স্তরের কিছু পদার্থ পৃথিবীর পৃষ্ঠে উঠে আসে। সেগুলো পরীক্ষা করেও পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

এছাড়া পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মহাকর্ষের তথ্যও গবেষণায় কাজে লাগে।

শেষ কথা

পৃথিবীর নিচে শুধু মাটি আর পাথরের স্তর নেই। এর গভীরে রয়েছে ভূত্বক, বিশাল ম্যান্টল এবং ধাতব কেন্দ্র।

নিচের দিকে যত এগোনো যায়, তাপমাত্রা ও চাপ তত বাড়ে। একই সঙ্গে পদার্থের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়।

পৃথিবীর গভীর অংশ তাই আমাদের কাছে এখনো অনেকটাই রহস্যময়। তবে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য সংগ্রহ করছেন।

ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি এবং পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের গবেষণা সেই রহস্য বুঝতে সাহায্য করছে। ফলে পৃথিবীর ভেতরের অদৃশ্য জগত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading