রকেট কিভাবে মহাকাশে যায়? সহজ ব্যাখ্যা

রকেট কিভাবে মহাকাশে যায়—এই প্রশ্নটি অনেকের মনে আসে। আকাশে উড়োজাহাজ উঠতে দেখেছি। তবে রকেট তার চেয়েও অনেক ওপরে যায়। এমনকি রকেট পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পেরিয়েও মহাকাশে পৌঁছাতে পারে। এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের বিশেষ কিছু নিয়ম। বিশেষ করে, রকেটের ইঞ্জিন শক্তিশালী ধাক্কা তৈরি করে। সেই ধাক্কার কারণে রকেট দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে থাকে।

রকেট কিভাবে মহাকাশে যায়

রকেট কীভাবে উড়ে?

রকেট মূলত নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র অনুসরণ করে। এই সূত্র অনুযায়ী, প্রত্যেক ক্রিয়ার বিপরীতে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

রকেটের ইঞ্জিনে জ্বালানি পোড়ানো হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে গরম গ্যাস তৈরি হয়। এরপর সেই গ্যাস খুব দ্রুত নিচের দিকে বের হয়ে যায়। ফলে রকেট বিপরীত দিকে, অর্থাৎ ওপরের দিকে এগিয়ে যায়।

তাই রকেটের উড্ডয়নের জন্য বাতাসের ওপর নির্ভর করতে হয় না। এ কারণে মহাকাশের প্রায় শূন্যস্থানেও রকেট চলতে পারে।

রকেটের ইঞ্জিন কীভাবে কাজ করে?

রকেটের ইঞ্জিনে সাধারণত জ্বালানি এবং অক্সিডাইজার থাকে। এগুলো দহনকক্ষে প্রবেশ করে এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর শক্তি তৈরি করে।

এর ফলে অত্যন্ত গরম ও উচ্চচাপের গ্যাস তৈরি হয়। পরে সেই গ্যাস একটি বিশেষ নোজল দিয়ে প্রচণ্ড বেগে বের হয়।

গ্যাস নিচের দিকে বের হওয়ার সময় রকেট বিপরীত দিকে এগিয়ে যায়। এভাবেই রকেট ধীরে ধীরে গতি বাড়ায়।

রকেট কেন এত দ্রুত ওপরে ওঠে?

রকেটকে শুধু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিরুদ্ধে উঠতে হয় না। তাকে বায়ুর বাধাও অতিক্রম করতে হয়। তাই রকেটের ইঞ্জিনকে প্রচুর থ্রাস্ট তৈরি করতে হয়।

উড্ডয়নের শুরুতে রকেটের ওজন সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ তখন রকেটের ভেতরে প্রচুর জ্বালানি থাকে। জ্বালানি পোড়ার সঙ্গে সঙ্গে রকেটের ওজন কমতে থাকে।

ফলে পরবর্তী পর্যায়ে একই ধরনের থ্রাস্টে রকেট আরও দ্রুত গতি অর্জন করতে পারে।

রকেট কি সরাসরি মহাকাশে যায়?

না, সাধারণত রকেট সোজা ওপরের দিকে গিয়ে থেমে থাকে না। প্রথমে রকেট ওপরের দিকে ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে তার গতিপথ বাঁকানো হয়।

এটিকে অনেক সময় gravity turn বলা হয়। এর ফলে রকেট পৃথিবীর চারদিকে কক্ষপথে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অনুভূমিক গতিও অর্জন করে।

শুধু অনেক ওপরে উঠলেই কক্ষপথে থাকা যায় না। কক্ষপথে থাকতে যথেষ্ট পার্শ্বীয় গতি দরকার।

রকেটের একাধিক ধাপ কেন থাকে?

অনেক মহাকাশ রকেট একাধিক ধাপে তৈরি হয়। প্রতিটি ধাপে আলাদা ইঞ্জিন ও জ্বালানি থাকতে পারে।

প্রথম ধাপের জ্বালানি শেষ হলে সেটি রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে অপ্রয়োজনীয় ওজন আর বহন করতে হয় না।

এরপর দ্বিতীয় ধাপ কাজ শুরু করে। প্রয়োজনে আরও ধাপ ব্যবহার করা হয়।

এভাবে রকেট ধাপে ধাপে হালকা হয়। ফলে বাকি ইঞ্জিনগুলো আরও কার্যকরভাবে মহাকাশযানকে গতি দিতে পারে।

মহাকাশে পৌঁছানো মানেই কি কক্ষপথে থাকা?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। মহাকাশের সীমানা পেরোনো এবং কক্ষপথে প্রবেশ করা একই বিষয় নয়।

রকেট যদি শুধু অনেক ওপরে উঠে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে, সেটি কক্ষপথে থাকা নয়। কক্ষপথে থাকতে হলে নির্দিষ্ট গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে হয়।

উদাহরণ হিসেবে, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা মহাকাশযানকে খুব বেশি অনুভূমিক গতি অর্জন করতে হয়। এই গতি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণভাবে কাজ করে।

রকেট মহাকাশে গিয়ে কী করে?

রকেটের প্রধান কাজ হলো মহাকাশযান, স্যাটেলাইট বা অন্যান্য পেলোডকে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া।

কিছু রকেট স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করে। আবার কিছু রকেট মহাকাশযানকে চাঁদ বা অন্য গ্রহের দিকে পাঠাতে সাহায্য করে।

এছাড়া মানুষ বহনকারী মহাকাশযানও রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা হয়।

রকেটের জ্বালানি কোথায় থাকে?

রকেটের ভেতরে বড় বড় ট্যাংকে জ্বালানি রাখা হয়। অনেক রকেটে তরল জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু রকেটে কঠিন প্রপেল্যান্ট ব্যবহার করা হয়।

তরল রকেট ইঞ্জিনে জ্বালানি এবং অক্সিডাইজার আলাদা ট্যাংকে থাকতে পারে। এগুলো ইঞ্জিনে পৌঁছে দহন প্রক্রিয়া শুরু করে।

মহাকাশে বাতাস খুব কম থাকায় রকেটকে নিজের অক্সিডাইজারও বহন করতে হয়। এ কারণেই রকেট উড়তে পৃথিবীর বায়ুর অক্সিজেনের ওপর নির্ভর করে না।

রকেট কীভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে?

সব রকেট একইভাবে ফিরে আসে না। কিছু রকেটের অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ধ্বংস হয়ে যায়। আবার কিছু আধুনিক রকেটের প্রথম ধাপ নিয়ন্ত্রিতভাবে ফিরে আসতে পারে।

ফিরে আসার সময় রকেটকে প্রচণ্ড তাপ সহ্য করতে হয়। তাই পুনঃব্যবহারযোগ্য অংশগুলো বিশেষ প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা হয়।

শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে অবতরণ করার জন্য ইঞ্জিন, ডানা বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হতে পারে।

সহজভাবে রকেটের মহাকাশযাত্রা

পুরো প্রক্রিয়াটি সহজভাবে কয়েকটি ধাপে বোঝা যায়।

প্রথমে রকেটের ইঞ্জিন চালু হয়। এরপর জ্বালানি থেকে শক্তিশালী গ্যাস তৈরি হয়। সেই গ্যাস নিচের দিকে বের হয়ে যায়।

ফলে রকেট ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে। পরে রকেট তার গতিপথ পরিবর্তন করে এবং আরও গতি অর্জন করে।

জ্বালানি শেষ হওয়া ধাপগুলো আলাদা হয়ে যায়। অবশেষে পেলোড নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছায়।

শেষ কথা

রকেট কিভাবে মহাকাশে যায়, তা বুঝতে মূলত থ্রাস্ট, মাধ্যাকর্ষণ এবং গতি সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। রকেটের ইঞ্জিন গ্যাসকে প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে বের করে দেয়। ফলে রকেট বিপরীত দিকে এগিয়ে যায়।

তবে মহাকাশে পৌঁছানো একটি জটিল প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। এতে সঠিক গণনা, শক্তিশালী ইঞ্জিন এবং উন্নত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দরকার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মানুষ এখন নিয়মিত রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে স্যাটেলাইট ও মহাকাশযান পাঠাতে পারছে।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading