ভোরের কুয়াশা তখনও কাটেনি। মহাস্থানগড়ের পুরোনো তোরণটি রহস্যময় লাগছিল। সেখানেই নতুন বিপদে পড়ল রহস্য সন্ধানী আদি। তার গলায় ছিল প্রিয় ক্যামেরা। পাশে ছিলেন তার প্রত্নতাত্ত্বিক মামা। তাদের হাতে ছিল একটি পুরোনো মানচিত্র। মানচিত্রে তোরণের একটি জায়গা চিহ্নিত ছিল।

তোরণের আড়ালে অচেনা লোক
মানচিত্র অনুযায়ী জায়গাটি ছিল তোরণের ডানদিকে। সেখানে ছিল তিন নম্বর ইট। আদি চারপাশ ভালোভাবে দেখছিল। হঠাৎ দেয়ালের আড়ালে একজন লোককে দেখা গেল।
লোকটির হাতে ছিল শকুনের একটি চিহ্ন।
আদি সঙ্গে সঙ্গে মামাকে সতর্ক করল।
“মামা, সাবধানে থাকুন!”
ঠিক তখন ঝোপের আড়াল থেকে আরও দুজন লোক বেরিয়ে এল। ফলে আদি এবং মামা চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে গেলেন।
দলের নেতা সামনে এগিয়ে এল। তারপর সে বলল, “মানচিত্রটা আমাদের হাতে দাও।”
তবে মামা কোনো উত্তর দিলেন না। বরং তিনি চারপাশের পথ দেখছিলেন। কারণ, তিনি পালানোর একটি পথ খুঁজছিলেন।
আদির ক্যামেরাই হলো অস্ত্র
এদিকে আদির মাথায় একটি বুদ্ধি এল। তার গলায় তখনও ক্যামেরাটি ঝুলছিল।
সে দ্রুত ক্যামেরাটি হাতে নিল। এরপর লোকগুলোর দিকে লেন্স তাক করল।
ঝিলিক! ঝিলিক! ঝিলিক!
ক্যামেরার তীব্র আলোয় লোকগুলো চোখ বন্ধ করে ফেলল। ফলে তারা কিছুক্ষণ কিছুই দেখতে পেল না।
এই সুযোগে আদি চিৎকার করে বলল,
“তিন নম্বর ইট, মামা!”
সঙ্গে সঙ্গে মামা দেয়ালের কাছে ছুটে গেলেন। মানচিত্র দেখে তিনি তিন নম্বর ইটে চাপ দিলেন।
অমনি ভেতর থেকে ঘড়ঘড় শব্দ হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেয়ালের একটি অংশ সরে গেল। সেখানে ছোট একটি গোপন জায়গা দেখা গেল।
ভেতরে রাখা ছিল একটি ছোট ব্রোঞ্জের বেলন।
মামা সেটি হাতে তুলে নিলেন। তার চোখে তখন বিস্ময়।
বেলন নিয়ে শুরু হলো ধাওয়া
ইতিমধ্যে লোকগুলোর চোখের সমস্যা কেটে গেছে। দলের নেতা বেলনটি দেখে দ্রুত এগিয়ে এল।
“ওটা আমাকে দাও!”
এই বলে সে বেলনটির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তবে আদি দ্রুত মামাকে সরিয়ে দিল।
ফলে বেলনটি মাটিতে পড়ে গেল।
আদি এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দৌড়ে গিয়ে বেলনটি তুলে নিল। তারপর জ্যাকেটের ভেতর সেটি লুকিয়ে ফেলল।
দলের নেতা রেগে চিৎকার করে উঠল।
“ছেলেটাকে ধর!”
তাই আদি এবং মামা দ্রুত তোরণের পেছনের পথে দৌড় দিলেন। পেছন থেকে লোকগুলোও তাদের ধরতে ছুটল।
অন্ধকার পথে নতুন রহস্য
পথটি ছিল সরু এবং অন্ধকার। তাই আদি তার টর্চ জ্বালাল।
হঠাৎ দেয়ালের ওপর কিছু অদ্ভুত চিহ্ন দেখা গেল।
“মামা, এখানে কিছু লেখা আছে!”
মামা কাছে গিয়ে চিহ্নগুলো দেখলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন,
“এগুলো সাধারণ চিহ্ন নয়।”
আদি জানতে চাইল, “তাহলে এগুলো কী?”
“সম্ভবত কোনো গোপন খবর।”
এরপর মামা ব্রোঞ্জের বেলনটি হাতে নিলেন। তিনি দেয়ালের চিহ্নের সঙ্গে বেলনের নকশা মিলিয়ে দেখলেন।
হঠাৎ তার মুখ বদলে গেল।
“আদি, এটা শুধু বেলন নয়।”
আদি অবাক হয়ে বলল, “তাহলে কী?”
মামা নিচু গলায় বললেন,
“এটা একটি চাবি।”
গোপন দরজা খুলে গেল
এবার আদি চারপাশে তাকাল। মাটিতে সে তিনটি পাথর দেখতে পেল।
একটি পাথরের ওপর ছিল একই চিহ্ন।
মামা বেলনের এক প্রান্ত একটি ছোট গর্তে বসালেন। তারপর ধীরে চাপ দিলেন।
ক্লিক!
সঙ্গে সঙ্গে দেয়াল কেঁপে উঠল।
ঘড়ঘড়ঘড়!
এরপর দেয়ালের একটি অংশ ধীরে ধীরে সরে গেল। পেছনে দেখা গেল একটি অন্ধকার ঘর।
ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল।
আদি অবাক হয়ে বলল,
“মামা, এতদিন ধরে এটা এখানে লুকানো ছিল?”
মামা ধীরে উত্তর দিলেন,
“হয়তো এখানে বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে।”
বেলনের ভেতরে লুকানো মানচিত্র
ঠিক তখনই পেছন থেকে সেই লোকটির কণ্ঠ শোনা গেল।
“বেলনটা আমার হাতে দাও!”
সর্দার আবার তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
তবে এবার আদি বেলনটির দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ সে অদ্ভুত একটি শব্দ শুনল।
টিক… টিক… টিক…
আদি দ্রুত বলল,
“মামা, বেলনের ভেতরে কিছু আছে!”
সঙ্গে সঙ্গে মামা বেলনটি পরীক্ষা করলেন। এরপর তিনি একটি অংশ ঘুরিয়ে দিলেন।
ক্লিক!
বেলনের এক প্রান্ত খুলে গেল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এল পাতলা একটি তামার পাত। তার ওপর ছিল কিছু অদ্ভুত চিহ্ন।
মামা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।
অবশেষে তিনি বললেন,
“এটা একটি মানচিত্র!”
আদি অবাক হয়ে পাতটির দিকে তাকিয়ে রইল।
মানচিত্রে মহাস্থানগড়ের নিচের একটি গোপন পথ দেখানো ছিল।
মানচিত্রে শকুনের চিহ্ন
এদিকে সকালের আলো ধীরে ধীরে কুঠুরির ভেতরে ঢুকছিল। আলো পড়তেই তামার পাতের কিছু চিহ্ন ঝলমল করে উঠল।
মানচিত্রের মাঝখানে ছিল একটি শকুনের চিহ্ন।
আদি সঙ্গে সঙ্গে সর্দারের হাতে তাকাল।
“মামা, এই চিহ্নটা ওর হাতেও আছে!”
মামা ধীরে মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ।”
আদি আবার প্রশ্ন করল,
“এর মানে কী?”
মামা নিচু গলায় বললেন,
“এটা হয়তো একটি গোপন দলের চিহ্ন।”
কথাটি শুনেই সর্দারের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
রহস্যময় লোকটির আগমন
ঠিক তখনই অন্ধকার পথ থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ঠক… ঠক… ঠক…
কিছুক্ষণ পর কুয়াশার ভেতর থেকে একজন নতুন লোক বেরিয়ে এল।
তার হাতেও একই শকুনের চিহ্ন ছিল।
লোকটি সর্দারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওদের ছেড়ে দাও।”
সর্দার সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
ফলে আদি বুঝতে পারল, নতুন লোকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ।
এরপর লোকটি মামার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে হাসল।
“অনেক বছর পর আবার দেখা হলো।”
মামার মুখ সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
আদি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মামা, আপনি তাকে চেনেন?”
তবে মামা কোনো উত্তর দিলেন না।
বরং তার চোখে ভয় দেখা গেল।
মহাস্থানগড়ের নিচে কী আছে?
হঠাৎ কুঠুরির ভেতর থেকে ধাতব শব্দ হলো।
টং!
কিছুক্ষণ পর আবার শব্দ হলো।
টং!
মনে হলো, বহু বছর পর কোনো পুরোনো যন্ত্র চালু হয়েছে।
তাই মামা দ্রুত আদির হাত ধরলেন।
“আদি, আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।”
আদি অবাক হয়ে বলল,
“কিন্তু কেন?”
মামা তামার মানচিত্রের দিকে তাকালেন।
“কারণ আসল রহস্যটা এই ঘরে নেই।”
আদি আবার জানতে চাইল,
“তাহলে কোথায়?”
মামা ধীরে উত্তর দিলেন,
“মহাস্থানগড়ের মাটির নিচে।”
ঠিক তখনই কুঠুরির দরজা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
ধাম!
চারপাশ মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল।
এরপর অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি ফিসফিস শব্দ ভেসে এল।
“ফিরে যাও… এখনও সময় আছে…”
আদি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তবে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় তখনও বাকি ছিল।
হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে আবার একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
“নইলে ইতিহাস তোমাদের ক্ষমা করবে না…”
এবার আদি বুঝতে পারল, তাদের সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
- শকুনের দল আসলে কারা?
- রহস্যময় লোকটি কে?
- মামা তাকে আগে থেকে কীভাবে চেনেন?
- মহাস্থানগড়ের নিচে কী লুকিয়ে আছে?
- ব্রোঞ্জের মানচিত্র তাদের কোথায় নিয়ে যাবে?
চলবে…









