শীতকালে কিছু প্রাণী দীর্ঘ সময় খাবার না খেয়ে থাকতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো ভালুক। শীতের সময় ভালুক দীর্ঘ সময় গর্ত বা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে। এ সময় তাদের শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম অনেকটা ধীর হয়ে যায়। ফলে তারা দীর্ঘ সময় খাবার ছাড়াই থাকতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ভালুককে সাধারণভাবে শীতনিদ্রার প্রাণী বলা হলেও, তাদের শীতকালীন ঘুম সব প্রজাতির ক্ষেত্রে একই রকম নয়।

ভালুক শীতকালে খাবার খায় না কেন?
শীতকালে অনেক অঞ্চলে খাবারের পরিমাণ কমে যায়। তাপমাত্রাও অনেক কম থাকে। তাই ভালুক শীতের আগে প্রচুর খাবার খেয়ে শরীরে চর্বি জমায়।
এই জমা চর্বিই শীতকালে তাদের প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। ফলে আশ্রয়ে থাকার সময় তাদের নিয়মিত খাবার খাওয়ার প্রয়োজন হয় না।
এ সময় তাদের হৃদস্পন্দন ও বিপাকের হার কমে যায়। একই সঙ্গে শারীরিক কর্মকাণ্ডও অনেক কমে যায়।
ভালুক কতদিন খাবার ছাড়া থাকতে পারে?
প্রজাতি, বয়স, পরিবেশ এবং শারীরিক অবস্থার ওপর সময় নির্ভর করে। কিছু ভালুক কয়েক মাস পর্যন্ত খুব কম খাবার গ্রহণ করে আশ্রয়ে থাকতে পারে।
এই সময় তারা শরীরে আগে থেকে জমিয়ে রাখা চর্বি ব্যবহার করে। ফলে বাইরে খাবারের সন্ধানে যাওয়ার প্রয়োজন অনেক কমে যায়।
তবে এটি সম্পূর্ণ অনাহার হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাদের শরীরে আগে থেকেই সঞ্চিত শক্তি থাকে।
শীতের আগে ভালুক কী করে?
শীত আসার আগে ভালুক প্রচুর খাবার খায়। এই সময়কে অনেক ক্ষেত্রে হাইপারফেজিয়া বলা হয়।
তারা ফল, বাদাম, মাছ, পোকামাকড় এবং অন্যান্য সহজলভ্য খাবার খেতে পারে। খাবারের ধরন অবশ্য প্রজাতি ও আবাসস্থল অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
এর ফলে শরীরে প্রচুর চর্বি জমে। পরে শীতকালে সেই চর্বি ধীরে ধীরে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
শীতকালে ভালুকের শরীরে কী ঘটে?
শীতকালে ভালুকের শারীরিক কার্যক্রম অনেকটাই কমে যায়। তারা দীর্ঘ সময় ঘুম বা বিশ্রামের মতো অবস্থায় থাকে।
তাদের বিপাকীয় হার কমে যায়। ফলে শরীরে শক্তির ব্যবহারও কম হয়।
এ কারণে জমা চর্বি অনেক দিন ধরে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
ভালুক কি পুরো শীতকাল গভীর ঘুমে থাকে?
সব ভালুকের ক্ষেত্রে বিষয়টি একই নয়। অনেক ভালুকের শীতকালীন বিশ্রামকে টরপোর বলা বেশি উপযুক্ত।
এই অবস্থায় তাদের শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে। তবে অন্যান্য অনেক ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো তাপমাত্রা অত্যন্ত নিচে নেমে যায় না।
প্রয়োজনে ভালুক জেগে উঠতে এবং নড়াচড়া করতেও পারে।
কোন প্রাণী আরও দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে পারে?
ভালুক ছাড়াও কিছু প্রাণী শীতকালে খাদ্য গ্রহণ অনেক কমিয়ে দেয়। যেমন কিছু সাপ, ব্যাঙ, কচ্ছপ এবং অন্যান্য শীতল রক্তের প্রাণী ঠান্ডার সময় খুব কম সক্রিয় থাকে।
তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরিবেশের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। তাই ঠান্ডায় তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়।
ফলে তাদের খাবারের চাহিদাও অনেক কমে যায়।
ব্যাঙ শীতকালে কীভাবে থাকে?
কিছু ব্যাঙ শীতের সময় মাটির নিচে বা পানির তলায় আশ্রয় নেয়। ঠান্ডার কারণে তাদের শরীরের কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়।
এই সময় তারা খুব কম খাবার গ্রহণ করে। কিছু প্রজাতি দীর্ঘ সময় খাদ্য ছাড়াই থাকতে পারে।
তবে সব ব্যাঙ একইভাবে শীতকাল পার করে না।
সাপ কি শীতকালে খাবার খায়?
সাপ শীতল রক্তের প্রাণী। তাই ঠান্ডা আবহাওয়ায় তাদের শরীরের কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়।
অনেক অঞ্চলের সাপ শীতকালে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। এই অবস্থাকে ব্রুমেশন বলা হয়।
এ সময় তারা খুব কম সক্রিয় থাকে। ফলে তাদের খাবারের প্রয়োজনও অনেক কমে যায়।
কচ্ছপের ক্ষেত্রেও কি একই ঘটনা ঘটে?
কিছু কচ্ছপ ঠান্ডার সময় দীর্ঘ সময় খুব কম সক্রিয় থাকে। তারা পানির নিচে বা মাটির মধ্যে আশ্রয় নিতে পারে।
তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম ধীর হওয়ায় খাদ্যের চাহিদা কমে যায়। কিছু প্রজাতি দীর্ঘ সময় না খেয়েও থাকতে পারে।
তবে প্রজাতিভেদে এই আচরণে পার্থক্য রয়েছে।
শীতনিদ্রা ও না খাওয়া কি একই বিষয়?
না, দুটি বিষয় এক নয়। শীতনিদ্রা হলো একটি শারীরবৃত্তীয় অবস্থা। আর না খাওয়া হলো খাদ্য গ্রহণের অভাব।
শীতনিদ্রার সময় প্রাণীর বিপাকীয় কার্যক্রম কমে যেতে পারে। ফলে তার শক্তির চাহিদাও কমে যায়।
তাই কিছু প্রাণী এই সময় দীর্ঘদিন খাবার ছাড়াই থাকতে পারে।
কেন প্রাণীরা এমন করে?
প্রধান কারণ হলো শক্তি সাশ্রয়। শীতকালে খাবার পাওয়া কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে ঠান্ডায় শরীর সচল রাখতে বেশি শক্তি প্রয়োজন হতে পারে।
তাই কিছু প্রাণী আগে থেকেই শরীরে শক্তি জমিয়ে রাখে। পরে শীতকালে সেই শক্তি ব্যবহার করে।
এটি প্রকৃতির একটি অসাধারণ অভিযোজন।
শেষ কথা
শীতকালে কিছু না খেয়ে থাকার প্রাণী হিসেবে ভালুক সবচেয়ে পরিচিত। তবে সাপ, ব্যাঙ ও কিছু কচ্ছপও ঠান্ডার সময় খুব কম খাবার গ্রহণ করে।
ভালুক শীতের আগে শরীরে চর্বি জমায়। পরে শীতকালীন বিশ্রামের সময় সেই সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে।
তাই বলা যায়, শীতকালে খাবার না খেয়ে থাকার ক্ষমতা প্রাণীদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।









