অধ্যায় ১: মানাউসের পথে যাত্রা (The Journey to Manaus)


অধ্যায় ১: মানাউসের পথে যাত্রা (The Journey to Manaus)

সকালের সূর্যটা তখনো আমাজনের গহীন অরণ্যের মাথার ওপর পুরোপুরি উঁকি দেয়নি। হালকা কুয়াশায় ঢাকা চারপাশটা কেমন যেন রহস্যময় দেখাচ্ছিল। আরিয়ান তার ব্যাকপ্যাকটা ভালো করে কাঁধে তুলে নিল। তার চোখেমুখে রোমাঞ্চের আভা, কিছু উত্তেজনা। কিন্তু মনের এক কোণে সামান্য ভয়ও উঁকি দিচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইরাকে দেখে অবশ্য বোঝার উপায় নেই সে ভয় পাচ্ছে কি না। ইরা তার ডিজিটাল ক্যামেরাটার লেন্স পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। সে সবসময়ই একটু বেশি সাহসী এবং ধীরস্থীর।

“মামা, মামী, আমরা আসছি!” ইরা একটু উঁচু গলায় বিদায় জানাল।
মামা-মামী তাদের দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিন্তিত মুখে হাসলেন। মামী এগিয়ে এসে দুজনের মাথায় হাত রাখলেন। “সাবধানে থেকো বাবা। আমাজন যতটা সুন্দর, তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। প্রকৃতির ওপর কখনো নিজের দখলদারি ফলাতে যেও না, শুধু সম্মান করো।”

মামা একটা ছোট জিপ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি আরিয়ানের হাতে একটা পুরোনো রূপোর লকেট ধরিয়ে দিলেন। লকেটটা হাতে নিতেই আরিয়ান অনুভব করল সেটা বরফের মতো ঠান্ডা। মামা নিচু স্বরে বললেন, “এটা তোমার নানাজির ছিল। তিনি বলতেন, আমাজনের গহীন অরণ্যে যখন সব দিক থেকে বিপদ ঘিরে ধরবে, এই লকেটটা তখন সঠিক পথের হদিস দেবে। জানি না কথাটার কতটুকু সত্যি, তবে এটা সবসময় সাথে রেখো।”

আরিয়ান লকেটটা পকেটে রেখে জিপে গিয়ে বসল। জিপের ড্রাইভার কার্লোস একজন স্থানীয় মানুষ, তার চামড়া রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সাথে সাথে ইঞ্জিনটা একটা বিকট শব্দ করে গর্জে উঠল। শহর থেকে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে তারা। পিচ ঢালা পথ শেষ হয়ে শুরু হলো এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তা। পথের ধুলোবালিতে চারপাশটা কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে এল।

রাস্তার দুই পাশে ঘন সবুজ দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল সব রেইনফরেস্টের গাছ। কিছু গাছ এত লম্বা যে তাদের মাথা দেখার জন্য ঘাড় পুরোপুরি পেছনে হেলিয়ে দিতে হয়। গাছের ডালে ডালে নাম না জানা রঙিন সব পাখি উড়ছে। আরিয়ান দেখল বিশাল এক নীল রঙের ম্যাকাও (Macaw) পাখি তাদের গাড়ির সমান্তরালে কিছুক্ষণ উড়ে গিয়ে আবার বনের ভেতরে হারিয়ে গেল। জঙ্গলটা যত ঘন হচ্ছে, বাতাসের আর্দ্রতা তত বাড়ছে। একটা ভেজা মাটির গন্ধ নাকে আসছে।

“আরিয়ান, দেখ!” ইরা জানলার বাইরে ইশারা করল।

বনের মাঝ দিয়ে একটা সরু ঝরনা বয়ে চলেছে। তার স্বচ্ছ জল পাথরে ধাক্কা খেয়ে সাদা ফেনা তৈরি করছে। কিন্তু যত তারা এগোচ্ছে, জঙ্গলটা ততই অন্ধকার হয়ে আসছে। সূর্যের আলো আর মাটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে না। লম্বা লম্বা গাছের ঘন পাতার ছাউনি আকাশটাকে ঢেকে ফেলেছে। কার্লোসকে গাড়ির হেডলাইট জ্বালাতে হলো। মাঝেমধ্যে বনের ভেতর থেকে এমন সব অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে যা আগে কখনো তারা শোনেনি। কোনোটা তীক্ষ্ণ শিস দেওয়ার মতো, আবার কোনোটা ভারী গর্জনের মত।

সন্ধ্যার ঠিক আগে তারা পৌঁছাল আমাজন তীরের ছোট্ট গ্রাম ‘মানাউস’-এ। গ্রামটা ঠিক ছবির মতো সুন্দর। ছোট ছোট কাঠের ঘর, যার বেশিরভাগই খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—যাতে বর্ষাকালে নদীর জল বাড়লে ঘরে না ঢোকে। আমাজন নদীর একটা শান্ত শাখা এই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে।

গ্রামের মাঝখানে একটা বড় আগুনের কুণ্ডলী জ্বালানো হয়েছে। সেখানে কিছু বয়স্ক মানুষ গোল হয়ে বসে কথা বলছেন। কার্লোস তাদের সেখানে নিয়ে গেল। গ্রামবাসীরা তাদের সাদরে গ্রহণ করল। আগুনের পাশে বসে তারা যখন গরম কফি খাচ্ছিল, তখন একজন বৃদ্ধ লোক—যার নাম আন্তোনিও—আরিয়ানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তার মুখজুড়ে গভীর বলিরেখা, যেন আমাজনের মানচিত্র আঁকা আছে সেখানে।

আন্তোনিও আগুনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “তোমরা যারা শহর থেকে আসো, তারা জঙ্গলকে শুধু গাছ আর জীবজন্তু ভাবো। কিন্তু মনে রেখ আমাজনের একটা নিজস্ব আত্মা আছে, সে কথা বলতে পারে। যদি কখনো শোনো জঙ্গল তোমাদের কারো নাম ধরে ডাকছে, তবে ভুলেও পেছনে ফিরে তাকাবে না।”

ইরার হাত থেকে কফির কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। বৃদ্ধ আন্তোনিও আরও বললেন, “কিছু জায়গায় প্রাচীন পাথরের গায়ে তোমরা অদ্ভুত সংকেত দেখতে পাবে। যদি দেখো সেই সংকেতগুলো জ্বলছে, তবে জানবে তোমরা এমন এক জায়গায় ঢুকে পড়েছ যা মানুষের জন্য নিষিদ্ধ।”

রাত বাড়ার সাথে সাথে আমাজনের রাত জাগা পাখিদের ডাক আরও তীব্র হতে লাগল। আরিয়ান আর ইরা তাদের জন্য বরাদ্দ করা ছোট কাঠের ঘরে শুয়ে জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মনে হচ্ছিল, ওই অন্ধকার জঙ্গল যেন তাদের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। কালকের সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই শুরু হবে তাদের জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায়

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading