পর্ব-২ অরণ্যে প্রবেশ (Entering the Deep Wild)
ভোরের আলো ফোটার আগেই আরিয়ান আর ইরার ঘুম ভেঙে গেল। আমাজনের সকালটা শহরের মতো নয়; এখানে পাখির কিচিরমিচির আর বানরের চিৎকারে মনে হয় পুরো জঙ্গলটাই যেন একসাথে জেগে উঠেছে। তারা দ্রুত তৈরি হয়ে নিল। তাদের সাথে আজ যোগ দিয়েছে স্থানীয় গাইড ‘জোসে’। জোসে এই জঙ্গলের প্রতিটি জায়গা চেনে। তার কাঁধে একটা লম্বা দা এবং হাতে একটা পুরোনো ম্যাপ।
নদীর ঘাটে একটি ছোট কাঠের নৌকা বা ‘ক্যানো’ অপেক্ষা করছিল। তারা নৌকায় চড়ে রিও নেগ্রো নামক নদীর শান্ত কিন্তু কালো জলের ওপর দিয়ে যাত্রা শুরু করল। নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই। নদীর দুই পাশের গাছের শিকড়গুলো জলের ভেতর সাপের মতো ঢুকে আছে। মাঝেমধ্যে জলের ওপর দিয়ে গোলাপি ডলফিন বা ‘বোটো’দের উঁকি দিতে দেখা যাচ্ছিল। ইরা তার ক্যামেরা বের করে ঝটপট কিছু ছবি তুলে নিল।
“সাবধান!” জোসে হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠল।
নৌকার ঠিক সামনেই একটা বিশাল গাছের গুঁড়ি ভেসে আসছিল। জোসে দক্ষ হাতে নৌকার দিক পরিবর্তন করল। তারা মূল নদী ছেড়ে একটা সরু খালের ভেতর ঢুকে পড়ল। এখানে জঙ্গল এতই ঘন যে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারছে না। চারপাশটা যেন গোধূলির মতো অন্ধকার হয়ে আছে। বাতাসের আর্দ্রতায় শরীর ঘেমে ভিজে যাচ্ছে। আরিয়ান লক্ষ্য করল, তারা যতই গভীরে যাচ্ছে, তার পকেটে থাকা নানাজির দেওয়া লকেটটা ততই গরম হয়ে উঠছে।
“জোসে, আমরা এখন এখনকোথায়?” আরিয়ান জিজ্ঞেস করল।
জোসে ম্যাপের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “আমরা এখন ‘ইগাপো’ বা প্লাবিত বনের ভেতরে আছি। এখান থেকে আমাদের পায়ে হাঁটতে হবে। নৌকা আর এগোতে পারবে না।”
তারা নৌকা থেকে নেমে কাদাটে মাটিতে পা রাখল। চারপাশটা নিস্তব্ধ, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার মাঝেও এক অদ্ভুত বিপদের গন্ধ ছিল। জোসে তার দা দিয়ে সামনের লতাগুল্ম কেটে পথ তৈরি করতে লাগল। হঠাৎ ইরা একটা বিশালাকার গাছের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। গাছটা অন্য সব গাছের চেয়ে আলাদা; এর ছাল যেন রুপালি রঙের।
“আরিয়ান, এদিকে দেখ!” ইরা উত্তেজিত গলায় ডাকল।
গাছের গুঁড়িতে কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কিছু একটা খোদাই করা হয়েছে। কিন্তু এটা কোনো মানুষের নাম বা সাধারণ চিহ্ন নয়। এটা দেখতে অবিকল কম্পিউটারের কিউআর কোড (QR Code) বা ডিজিটাল সার্কিটের মতো। খোদাই করা জায়গাগুলো থেকে হালকা নীল রঙের আভা বেরোচ্ছে। জোসে চিহ্নটা দেখামাত্র দুই পা পিছিয়ে গেল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক।
“এটা অসম্ভব! এই চিহ্নের কথা আমার দাদা বলতেন,” জোসে ফিসফিস করে বলল। “একে বলা হয় ‘অরণ্যের চোখ’। যারা এই চিহ্ন দেখেছে, তাদের কেউ কোনোদিন আর ফিরে যায়নি। আমাদের এখনই ফিরে যাওয়া উচিত।”
আরিয়ান তার হাত দিয়ে চিহ্নটা স্পর্শ করতে চাইল। কিন্তু হাত কাছে নিতেই এক তীব্র বৈদ্যুতিক শক তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে জঙ্গলের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ ভেসে এল—ঠিক যেন কোনো ড্রোন বা মেশিনের শব্দ। কিন্তু এই গহীন জঙ্গলে মেশিন আসবে কোত্থেকে?
আরিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে ধুলো ঝাড়ল। সে বুঝতে পারল, তারা সাধারণ কোনো অভিযানে আসেনি। এই অরণ্যের ভেতর কেউ একজন বা কোনো গোষ্ঠী এমন কিছু লুকাতে চাইছে যা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে যুক্ত। লকেটটা এখন আরিয়ানের পকেটে রীতিমতো জ্বলছে। সে ইরার দিকে তাকিয়ে দেখল, ইরাও তার ক্যামেরা নামিয়ে ফেলেছে। দুজনের মনেই এখন একটাই প্রশ্ন—জোসে কি তাদের সত্যিই রক্ষা করতে পারবে, নাকি তারা এক ভয়াবহ ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে?
পরের মুহূর্তেই এক বিশাল পাখির ডানার শব্দ তাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। কিন্তু কোনো পাখি দেখা গেল না। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর বনের গভীরে কোনো ভারী কিছু পতনের শব্দ হলো।
চলবে – আসছে শীগ্রি ৩য় পর্ব









