পুরান ঢাকার টমটম: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বর্তমান বাস্তবতা

পুরান ঢাকার টমটম: রাজকীয় ঐতিহ্যের শেষ জীবন্ত সাক্ষী

একসময় পুরান ঢাকার পিচঢালা কিংবা ইটের রাস্তায় ঘোড়ার খুরের সেই চেনা ছন্দময় আওয়াজ কান পাতলেই শোনা যেত। দূর থেকে “খট… খট…” শব্দ ভেসে আসা মানেই মানুষ বুঝে নিত—একটি টমটম আসছে। তখন এটি স্রেফ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার বাহন ছিল না; এর সাথে জড়িয়ে ছিল সামাজিক মর্যাদা, আভিজাত্য আর এক টুকরো আভিজাত্যের গল্প।

আজকের আধুনিক, যান্ত্রিক ঢাকার দিকে তাকালে সেই চিরচেনা দৃশ্যটি মেলা ভার। সাঁই সাঁই করে ছুটে চলা বাস, প্রাইভেট কার আর মাথার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া মেট্রোরেলের ভিড়ে টমটম আজ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তবুও পুরান ঢাকার জটলা পাকানো গলিপথে এখনো ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে শত বছরের এই ঐতিহ্য। আধুনিকতার আগ্রাসনেও টমটম আজও ঢাকার সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল।

ইতিহাসের পাতা থেকে
পুরান ঢাকার এই ঘোড়ার গাড়ির ইতিহাস ঘাঁটলে প্রায় ২০০ বছর পেছনে ফিরে যেতে হয়। ঠিক কবে থেকে এর যাত্রা শুরু, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে—কেউ বলেন ১৮৩০ সাল, আবার কারো মতে ১৮৫৬।

তবে বেশির ভাগ গবেষক একমত যে, জি. এম. সিরকো নামের এক আর্মেনীয় ব্যবসায়ী ঢাকায় প্রথম বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন করেন। তাঁর হাত ধরেই মূলত এই বাহনটি শহরের মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে ওঠে। তৎকালীন ঢাকা যখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ডালপালা মেলছিল, তখন দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য টমটমের চেয়ে ভালো বিকল্প আর ছিল না।

ঠিকাগাড়ি থেকে টমটম
একেবারে শুরুর দিকে এই বাহনটিকে মানুষ ‘ঠিকাগাড়ি’ নামে ডাকত। তারও আগে ‘ক্রাঞ্চি’ বা ‘ক্রাহানঞ্চি’ নামের এক ধরনের আদিম ঘোড়ার গাড়ির চল ছিল। সময়ের আবর্তনে এই গাড়িগুলোর গড়নে বদল আসে এবং প্রধান দুটি রূপ মানুষের মন কেড়ে নেয়:

১. ট্যাঙ্গা: এটি ছিল বেশ হালকা আর খোলা মেলা ধরনের গাড়ি, যা টেনে নিয়ে যেত একটিমাত্র ঘোড়া।
২. টমটম: এটি চার চাকার, বেশ বড়সড় এবং রাজকীয়ভাবে সাজানো যাত্রীবাহী গাড়ি। এক বা দুটি ঘোড়া দিয়ে টানা এই গাড়িগুলো দূরপাল্লার যাতায়াতে আরাম এনে দিত।

আভিজাত্যের প্রতীক থেকে সাধারণের বাহন
উনিশ শতক বা বিশ শতকের শুরুর দিকে টমটমে চড়া মানেই ছিল অন্যরকম এক দেমাগ। ব্রিটিশ বাবু, নামকরা জমিদার, নামী ব্যবসায়ী কিংবা ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যরা টমটম ছাড়া চলার কথা ভাবতেই পারতেন না। কার গাড়ি কতটা জমকালো, তা দেখে মাপা হতো তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি।

টমটমের খাতিরেই তখন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ইট আর সিমেন্টের রাস্তা পাকা করা হয়েছিল। ১৮৬৭ সালের দিকে যেখানে লাইসেন্স নেওয়া টমটম ছিল মাত্র ৬০টি, সেখানে মাত্র কুড়ি বছরের ব্যবধানে ১৮৮৯ সালে সেই সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে যায়।

ধীরে ধীরে এটি শুধু বড়লোকদের ড্রয়িংরুমের শৌখিনতা থেকে বেরিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের জেলা ও মহকুমা শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। আজকের দিনে আমরা যেভাবে বাস বা সিএনজিতে চড়ি, ঠিক তেমনি আধুনিক গণপরিবহন আসার আগে দূর-দূরান্তের হাট-বাজার কিংবা এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল এই ঘোড়ার গাড়ি।

কাঠের চাকার সেই হারানো সুর

পুরনো দিনের টমটমের আসল সৌন্দর্য ছিল এর বিশাল আকৃতির কাঠের চাকা। ইটের রাস্তার ওপর দিয়ে যখন চাকাগুলো ঘুরত, তখন তৈরি হতো এক অদ্ভুত মায়াবী সুর। আজ আধুনিক পিচঢালা রাস্তার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে সেই কাঠের চাকা বদলে রবারের টায়ার বসেছে, আর তাতেই হারিয়ে গেছে সেই আদিম সুর।

বর্তমানে কেমন আছে টমটম?
সারা দেশ থেকে ঘোড়ার গাড়ি প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, পুরান ঢাকার কিছু মানুষ এখনো এই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। বর্তমানে এর দেখা মেলে মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট রুটে:

সদরঘাট থেকে গুলিস্তান

বংশাল ও বকশিবাজার

কেরানীগঞ্জের আশেপাশের এলাকা

আজকের দিনেও অনেকে স্রেফ যানজট এড়াতে কিংবা পুরান ঢাকার সেই পুরনো আমেজটা গায়ে মাখতে টমটমে চড়ে বসেন।

যুগের সাথে বদল
দিন বদলের সাথে সাথে টমটমের চেহারায়ও পরিবর্তন এসেছে। ঐতিহ্যের খাতিরে কাঠের চাকা ধরে রাখা এখন অসম্ভব। তাই এখনকার বেশির ভাগ টমটমেই পুরোনো মাইক্রোবাস বা গাড়ির রবারের টায়ার ব্যবহার করা হয়। এতে ঝাঁকুনি কমে, পিচঢালা রাস্তায় ঘোড়ার কষ্টও কিছুটা লাঘব হয়। তবে এই রবারের চাকা আসার পর টমটমের সেই চিরচেনা রূপ আর খটখট শব্দটা বিলীন হয়ে গেছে।

উৎসবের নতুন অনুষঙ্গ

দৈনন্দিন যাতায়াতে মার খেলেও উৎসব-পার্বণে টমটমের কদর এখনো আকাশচুম্বী। বিশেষ করে—

বিয়েবাড়িতে বরযাত্রী বহনে

পহেলা বৈশাখের বর্ণিল শোভাযাত্রায়

বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘র‍্যাগ ডে’ বা বিদায় অনুষ্ঠানে

নানা রকম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক র্যালিতে

নাটক, সিনেমা বা মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ে

রঙিন রিকশা পেইন্টিং আর জমকালো সাজে সজ্জিত একটি টমটম এখনো চোখের পলকে মানুষের মন কেড়ে নেয়।

কোচওয়ানদের যাপিত জীবন ও প্রাণিকল্যাণ
একসময়ের ব্যস্ততম এই বাহনটি এখন বড্ড একাকী। ঢাকার রাজপথে এখন বড়জোর ৩০ থেকে ৪০টির মতো টমটম নিয়মিত চোখে পড়ে। ঘোড়ার দানা-পানি, ওষুধ আর আনুষঙ্গিক রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দিন দিন আকাশ ছুঁয়েছে। অথচ সেই তুলনায় আয় এক প্রকার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এরপরেও অনেক কোচওয়ান স্রেফ বাপ-দাদার স্মৃতি আর এই পেশার প্রতি ভালোবাসার টানে এখনো চাবুক হাতে তুলে নেন।

তবে এর সাথে জড়িয়ে আছে বোবা প্রাণীগুলোর ভালো-মন্দের প্রশ্নও। প্রাণী অধিকারকর্মীরা প্রায়ই বলেন, তপ্ত পিচঢালা রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৌড়ানোর ফলে ঘোড়ার খুর নষ্ট হয়ে যায়। তদুপরি, আয়ের টানাপোড়েনের কারণে অনেক সময় ঘোড়াকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার বা ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে হলে ঘোড়াগুলোর সুস্বাস্থ্যের দিকেও সমান নজর দেওয়া দরকার।

কেন আমাদের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা উচিত?

টমটম স্রেফ কাঠ আর ঘোড়ার কোনো গাড়ি নয়; এটি আমাদের ইতিহাসের একটা বড় অংশ। বিশ্বের বহু ঐতিহাসিক শহরে ঘোড়ার গাড়িকে পর্যটনের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। আমরাও যদি একটু পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু রুট তৈরি করে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ঘোড়াগুলোর সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি, তবে পুরান ঢাকার এই টমটম দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে দারুণ এক আকর্ষণ হতে পারে। এতে যেমন আমাদের সংস্কৃতি বাঁচবে, তেমনি বেঁচে থাকবে এই পেশার সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর রুটি-রুজি।

শেষ কথা
পুরান ঢাকার টমটম আমাদের চোখের সামনে এক জীবন্ত ইতিহাস। একসময় যা ছিল নবাব-জমিদারদের অহংকার, আজ তা নগরজীবনের যান্ত্রিকতায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ব্যস্ত। ঐতিহ্য রক্ষা, প্রাণিকল্যাণ আর পর্যটনকে এক সুতোয় বাঁধতে পারলে এই ঐতিহাসিক বাহনটি হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছেও টিকে থাকবে এক জীবন্ত রূপকথা হয়ে।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading