কুয়াশার স্টেশনে এক অদ্ভুত সকাল
ট্রেনটা আসতে দেরি করছিল।
অপেক্ষারও একটা নিজস্ব শব্দ আছে। খুব ক্ষীণ, প্রায় শোনা যায় না। তবে নির্জন স্টেশনে বসে থাকলে সেই শব্দ কানের ভেতর নয়, সোজা বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করে।
গাজীপুরের ছোট্ট স্টেশনটা সেদিন ঘন কুয়াশায় চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। দূরের সিগন্যাল বাতিটা কুয়াশার সাদা দেয়ালের আড়ালে অস্পষ্ট এক বিন্দু হয়ে আছে। প্ল্যাটফর্মে দু-একজন যাত্রী দাঁড়িয়ে, কিন্তু তাদের দেখে মনে হয় না রক্ত-মাংসের মানুষ; কুয়াশায় ধূসর হয়ে যাওয়া কোনো অশরীরী ছায়া যেন।
পুরনো কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলেন মেহেদী হাসান। শুভ্র পাঞ্জাবি, চুলে রুপালি আভা, চোখের কোণে বয়সের সূক্ষ্ম মানচিত্র। পাশে রাখা পুরনো চামড়ার ব্যাগটা দেখে মনে হয়, মানুষটি ভ্রমণে বের হন কম, স্মৃতির অলিগলিতেই পাড়ি জমান বেশি।
শীতের সকালগুলো বড় অদ্ভুত। কিছু সকাল বর্তমানের দেয়াল ভেঙে মানুষকে সোজা অতীতে নিয়ে যায়। মেহেদী হাসানও হয়তো তেমন কোনো টাইম মেশিনে চড়ে বসেছিলেন।
এমন সময় একজন ভদ্রমহিলা এসে তাঁর পাশে বসলেন।
প্রথমে তিনি তাকালেন না। বয়স বাড়লে মানুষ অচেনা মুখের প্রতি কৌতূহল হারিয়ে ফেলে। নিজের ভেতরের না-বলা গল্পগুলোই তখন বাইরের জগতের চেয়ে বেশি দামি মনে হয়।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তাঁর সে ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
মহিলাটি নিচু স্বরে বললেন, — আপনি মেহেদী হাসান?
কণ্ঠস্বরটা শোনা মাত্রই মেহেদী হাসানের বুকের ভেতর যেন বহুদিনের বন্ধ থাকা একটা জানালা আচমকা খুলে গেল। তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। চোখ দুটো প্রথমে মুখ দেখল না, দেখল এক আস্ত সময়কে। কয়েক সেকেন্ড মহাবিশ্ব স্থির হয়ে রইল।
তিনি কম্পিত কণ্ঠে বললেন, — আপনি?
মহিলাটি মৃদু হাসলেন। সেই হাসির ভাঁজে যেন বহু বছরের জমে থাকা বিষণ্ণতার ছোঁয়া। — ভুলও হতে পারে। তবে আপনাকে দেখে মনে হলো আপনি মেহেদী হাসান।
মেহেদী হাসানের হঠাৎ মনে হলো, পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকে যাদের আমরা ভুলি না, ভুলতে পারি না। শুধু তাদের নামটা অনেকদিন উচ্চারণ করা হয় না, এই যা। ধুলো পড়া ফ্রেমের ছবির মতো নামগুলো মনের এক কোণে পড়ে থাকে।
তিনি অনেকটা অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, — আপনি কে?
মহিলাটি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, — আমি নীলিমা।
নামটা কানে পৌঁছানোর সাথে সাথে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। চারপাশের কুয়াশা, স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, ভিড়—সব যেন এক নিমেষে দূরে সরে গেল। শুধু একটি নাম মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
নীলিমা।
একটা সময় ছিল, এই নামটা শুনলে তাঁর বুকের ভেতর বসন্তের হাওয়া বইত। আজও কি বইছে? নাকি মনের ভুল? তিনি গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। হ্যাঁ, বয়সের ছাপ পড়েছে মুখে, চুলে রুপালি রঙ ধরেছে। কিন্তু চোখ দুটো… চোখ দুটো ঠিক আগের মতোই আছে। কিছু চোখ কখনোই বুড়িয়ে যায় না।
— তুমি… নাসিরনগরের নাহিদা আন্টির মেয়ে?
নীলিমার চোখের কোণ ভিজে উঠল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, — তাহলে চিনতে পেরেছ?
ঠিক সেই মুহূর্তেই দূরে ট্রেনের দীর্ঘ হুইসেল শোনা গেল। যান্ত্রিক সেই শব্দটা যেন বহুদিন তালাবন্ধ রাখা স্মৃতির সিন্দুকের চাবি হয়ে এল।
নীলিমা মাথা নিচু করে বলল, — মা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তোমার লেখা চিঠিগুলো বালিশের নিচে রাখত। শেষ দিন পর্যন্ত… শুধু একটা প্রতীক্ষা নিয়ে বেঁচে ছিল।
মেহেদী হাসানের বুকের ভেতর এক অদৃশ্য শূন্যতা হাহাকার করে উঠল। কিছু অনুশোচনা থাকে, যেগুলোর কোনো ভাষা হয় না, শুধু দীর্ঘশ্বাস হয়। তিনি কিছু বলতে পারলেন না, শুধু মাথা নিচু করে রইলেন।
কুয়াশা ফুঁড়ে ট্রেনের হেডলাইট ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। স্টেশনের আলো-আঁধারিতে ট্রেনের লৌহকঠিন শরীর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দুজনের কাছেই মনে হলো—ট্রেন নয়, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো ঋতু ফিরে আসছে।
আর সেই ঋতুর নাম হয়তো… বসন্ত।









