৬০ বছর বয়সে প্রধান স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও সচেতন থাকার উপায়

৬০ বছর বয়সে সাধারণ স্বাস্থ্য ঝুঁকি, প্রতিরোধের উপায়

  ৬০ বছর বয়স জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই এই সময় শরীরের বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে নানা পরিবর্তন আসে। ফলে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। তবে সচেতন জীবনযাপন করলে অনেক সমস্যাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই আসুন, ৬০ বছর বয়সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১. হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ

বয়স বাড়লে রক্তনালীগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

করণীয়
লবণ কম খান।
অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন।
নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন।
ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করুন।

২. ডায়াবেটিস

বয়সের সঙ্গে শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনি, চোখ, স্নায়ু এবং হৃদযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

করণীয়

মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার সীমিত করুন।
নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন।
প্রতিদিন হাঁটুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন।

৩. অস্থি ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস)

বয়স বাড়লে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। ফলে সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

অস্টিওপোরোসিসের কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ হলো—

উচ্চতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া।
কুঁজো হয়ে হাঁটা।
দীর্ঘদিন পিঠে ব্যথা থাকা।
মেরুদণ্ডে ছোট ছোট কম্প্রেশন ফ্র্যাকচার হওয়া।

করণীয়

ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান।
পর্যাপ্ত ভিটামিন-ডি গ্রহণ করুন।
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৪. স্মৃতিভ্রংশ ও ডিমেনশিয়া

বয়সের সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে অতিরিক্ত ভুলে যাওয়া বা দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হলে সেটি ডিমেনশিয়ার লক্ষণ হতে পারে।

করণীয়

নিয়মিত বই পড়ুন।
ধাঁধা ও শব্দজট খেলুন।
নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান।

৫. দৃষ্টিশক্তির সমস্যা

৬০ বছরের পর ছানি, গ্লুকোমা এবং বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

করণীয়

বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা করুন।
ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার খান।
প্রয়োজনে সানগ্লাস ব্যবহার করুন।
দীর্ঘসময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার কমান।

৬. শ্রবণশক্তি হ্রাস

অনেকের বয়স বাড়ার সঙ্গে কানে কম শোনা শুরু হয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগ কমে যেতে পারে। এছাড়া মানসিক একাকীত্বও বাড়তে পারে।

করণীয়

উচ্চ শব্দ এড়িয়ে চলুন।
নিয়মিত শ্রবণ পরীক্ষা করুন।
প্রয়োজন হলে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করুন।

৭. হজমের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য

বয়স বাড়লে হজমের গতি কমে যায়। ফলে গ্যাস, অম্বল এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

করণীয়

আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
নিয়মিত হাঁটুন।
অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার কমান।

৮. কিডনি ও লিভারের সমস্যা

দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন, ডায়াবেটিস অথবা উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।

করণীয়

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।
অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলুন।

৯. শরীরের ভারসাম্য ও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি

বয়সের সঙ্গে পেশী দুর্বল হয়ে যায়। ফলে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

করণীয়

নিয়মিত ব্যালান্স এক্সারসাইজ করুন।
যোগব্যায়াম করুন।
ঘরের মেঝে পরিষ্কার রাখুন।
প্রয়োজন হলে হাঁটার সহায়ক লাঠি ব্যবহার করুন।

১০. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা

অবসর জীবন, একাকীত্ব অথবা প্রিয়জনকে হারানোর কারণে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি বিষণ্নতা ও উদ্বেগে ভুগতে পারেন।

করণীয়

পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটান।
নিজের পছন্দের শখ চালিয়ে যান।
সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিন।
প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

৬০ বছরের পর সুস্থ থাকার অতিরিক্ত পরামর্শ

সুস্থ থাকার জন্য শুধু রোগ প্রতিরোধ করাই যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন।
সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকুন।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন।
প্রয়োজনীয় টিকা সময়মতো নিন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
ইতিবাচক জীবনধারা অনুসরণ করুন।

উপসংহার

৬০ বছর বয়স মানেই অসুস্থ জীবন নয়। বরং এটি সচেতনভাবে সুস্থ থাকার নতুন সুযোগ। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্য, ব্যায়াম এবং ইতিবাচক মানসিকতা আপনাকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে। এছাড়া ছোট ছোট স্বাস্থ্য সমস্যাকে কখনোই অবহেলা করবেন না। প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতন থাকুন এবং সুস্থ, সক্রিয় ও আনন্দময় জীবন উপভোগ করুন।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading