সেরা প্যারিস ভ্রমণ পরিকল্পনা: এক দিনে আইকনিক দর্শনীয় স্থান (পর্ব–২)

এই অংশটি Part 1-এর ধারাবাহিকতা

চতুর্থ গন্তব্য: হোটেল দেজ ইঁভালিদ

প্রয়োজনীয় সময়: প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট

ঠিকানা: Place des Invalides, 75007 Paris

রু দ্য ল্যুনিভার্সিতে থেকে বের হয়ে কয়েক মিনিট হাঁটলেই চোখে পড়বে সোনালি গম্বুজের এক বিশাল স্থাপনা। দূর থেকেই ভবনটির সৌন্দর্য নজর কেড়ে নেয়। সূর্যের আলো পড়লে গম্বুজটি যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

এই ভবনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়। বরং এটি ফ্রান্সের সামরিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

ইতিহাসের গল্প

১৬৭১ সালে রাজা লুই চতুর্দশ এই কমপ্লেক্স নির্মাণের নির্দেশ দেন। সে সময় আহত ও অবসরপ্রাপ্ত সৈন্যদের থাকার জন্য একটি নিরাপদ জায়গার প্রয়োজন ছিল। তাই এই বিশাল স্থাপনাটি তৈরি করা হয়।

সময়ের সঙ্গে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বর্তমানে এখানে একাধিক সামরিক জাদুঘর রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের নানা সময়ের যুদ্ধের স্মারকও সংরক্ষিত আছে।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সমাধি

এই কমপ্লেক্সের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সমাধি।

বিশাল গম্বুজের নিচে লাল কোয়ার্টজাইট পাথরের তৈরি সমাধিটি রাখা হয়েছে। চারপাশের মার্বেল, ভাস্কর্য এবং স্থাপত্য পুরো পরিবেশকে গম্ভীর ও রাজকীয় করে তুলেছে।

ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে এই অংশটি অবশ্যই সময় নিয়ে দেখবেন।

ভেতরে কী দেখবেন?
নেপোলিয়নের সমাধি।
সামরিক ইতিহাসের প্রদর্শনী।
প্রাচীন অস্ত্র ও বর্ম।
যুদ্ধকালীন মানচিত্র।
ঐতিহাসিক সামরিক পোশাক।
সুন্দর গির্জার অভ্যন্তর।
ছবি তোলার সেরা সময়

সকালের শেষ ভাগ অথবা দুপুরের আগে এখানে ছবি তুললে আলো বেশ ভালো থাকে।

গম্বুজের বাইরের অংশ দূর থেকে তুললে সবচেয়ে সুন্দর দেখায়।

দুপুরের বিরতি

সকালের হাঁটাহাঁটি শেষে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া ভালো।

এই এলাকার আশপাশে অনেক ছোট ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ রয়েছে।

আপনি চাইলে হালকা স্যান্ডউইচ, কফি অথবা ফরাসি পেস্ট্রি খেতে পারেন।

অতিরিক্ত সময় নিয়ে ভারী খাবার না খাওয়াই ভালো।

কারণ সামনে দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অপেক্ষা করছে।

পঞ্চম গন্তব্য: লুভর মিউজিয়াম

প্রয়োজনীয় সময়: অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা

ঠিকানা: Rue de Rivoli, 75001 Paris

প্যারিসে এসে লুভর না দেখা অনেকটা অসম্পূর্ণ ভ্রমণের মতো।

এটি শুধু বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প জাদুঘর নয়। বরং এটি নিজেই একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।

প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন।

তাই আগে থেকেই পরিকল্পনা করে আসা সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।

রাজপ্রাসাদ থেকে বিশ্বের বিখ্যাত জাদুঘর

আজ যেখানে লুভর দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে একসময় একটি দুর্গ ছিল।

পরবর্তীতে এটি রাজপ্রাসাদে রূপান্তরিত হয়।

ফরাসি বিপ্লবের পর ভবনটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

এরপর ধীরে ধীরে এটি বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ শিল্প জাদুঘরে পরিণত হয়।

বর্তমানে এখানে হাজার বছরের ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে।

কাঁচের পিরামিডের গল্প

লুভরের প্রবেশপথে থাকা কাঁচের পিরামিড আজ প্যারিসের অন্যতম পরিচিত স্থাপত্য।

১৯৮৯ সালে এটি নির্মাণ করা হয়।

শুরুতে অনেকেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

তবে সময়ের সঙ্গে এটি লুভরের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।

আজ প্রায় প্রতিটি পর্যটক এখানেই প্রথম ছবি তোলেন।

লুভরের ভেতরে কী দেখবেন?

জাদুঘরের সংগ্রহ এত বিশাল যে এক দিনে সব দেখা সম্ভব নয়।

তাই আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা করে ঢোকা ভালো।

মোনালিসা

সবচেয়ে বেশি দর্শক ভিড় করেন মোনালিসার সামনে।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির এই বিখ্যাত চিত্রকর্মটি বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান শিল্পকর্ম।

ছবিটি তুলনামূলক ছোট হলেও এর জনপ্রিয়তা অসাধারণ।

তাই ভিড়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন।

ভেনাস দ্য মিলো

প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যের অন্যতম সেরা উদাহরণ এটি।

হাতবিহীন এই ভাস্কর্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দর্শকদের মুগ্ধ করে আসছে।

উইংড ভিক্টরি অব সামোথ্রেস

লুভরের আরেকটি বিখ্যাত ভাস্কর্য।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা এই শিল্পকর্মটি শক্তি ও বিজয়ের প্রতীক।

ইতালীয় রেনেসাঁর সংগ্রহ

মোনালিসার পাশাপাশি আরও অসংখ্য বিখ্যাত চিত্রকর্ম রয়েছে।

রেনেসাঁ যুগের শিল্পকলা ভালো লাগলে এই অংশে বেশি সময় দিন।

মিশরীয় নিদর্শন

প্রাচীন মিশরের হাজার বছরের ইতিহাস এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

মমি, ভাস্কর্য এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা নিদর্শন কাছ থেকে দেখা যায়।

এক দিনে লুভর ঘোরার কৌশল

অনেকেই ভুল করে সবকিছু দেখার চেষ্টা করেন।

ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

বরং একটি নির্দিষ্ট অংশ বেছে নিন।

ধীরে ধীরে সেটিই উপভোগ করুন।

এতে অভিজ্ঞতা অনেক ভালো হবে।

সময় বাঁচানোর পরামর্শ
অনলাইনে টিকিট কিনুন।
সকাল অথবা দুপুরের পর প্রবেশ করুন।
একটি মানচিত্র সংগ্রহ করুন।
আগে থেকেই কোন গ্যালারি দেখবেন ঠিক করুন।
অপ্রয়োজনীয় লাইনে দাঁড়াবেন না।
ফটোগ্রাফির জন্য দারুণ কিছু স্থান

লুভরের কাঁচের পিরামিড।

প্রধান প্রাঙ্গণ।

ঐতিহাসিক করিডর।

খোলা উঠান।

দীর্ঘ খিলানপথ।

প্রত্যেকটি জায়গাই ছবির জন্য অসাধারণ।

বিকেলের হাঁটা

লুভর থেকে বের হলে চারপাশের পরিবেশও উপভোগ করুন।

প্রাচীন স্থাপত্য, প্রশস্ত রাস্তা এবং শিল্পময় পরিবেশ প্যারিসকে অন্য মাত্রা দেয়।

তাড়াহুড়ো না করে কিছুক্ষণ হাঁটুন।

এতে শহরটিকে আরও কাছ থেকে অনুভব করতে পারবেন।

কিছু দরকারি ভ্রমণ পরামর্শ
সঙ্গে একটি পানির বোতল রাখুন।
আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করুন।
টিকিট আগে থেকেই বুক করুন।
ফোন ও ক্যামেরা চার্জ দিয়ে বের হন।
গুরুত্বপূর্ণ নথির কপি সঙ্গে রাখুন।
ব্যস্ত জায়গায় ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের দিকে খেয়াল রাখুন।
এরপর কী?

এখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে।

প্যারিসের পরিবেশ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

দিনের ব্যস্ততা মিলিয়ে শহরটি নতুন এক সৌন্দর্যে সাজতে শুরু করেছে।

এবার অপেক্ষা করছে সেন নদীর শান্ত জলরাশি।

সন্ধ্যার আলোয় নদীর বুক থেকে প্যারিসকে দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই ভোলার নয়।

(চলবে – Part 3)

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading