রহস্য সন্ধানী আদি#২: তিন সিংহের খোঁজে
পিস্তলের নলটা ঠিক মামার কপাল বরাবর তাক করা ছিল।
কালো পোশাক পরা লোকটার ঠাণ্ডা চোখের দিকে তাকিয়ে আদির বুক কাঁপছিল। তবুও, সে নিজেকে শক্ত রাখল। যেহেতু এখন ভয় পাওয়ার সময় নয়, তাই সে অন্য কিছু ভাবল।
“সোজা হাত ওপরে তোলো। আর বুড়ো, তোমার হাতের তামার পাতটা আমাদের দিকে ছুঁড়ে দাও,” লোকটা খসখসে গলায় বলল।
ড. আশরাফ কিন্তু মোটেও ভয় পেলেন না। উল্টো, তার খামখেয়ালী স্বভাব চাঙ্গা হয়ে উঠল। তদুপরি, তিনি চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে লোকটিকে বুড়ো বলার কারণ জিজ্ঞেস করলেন।
“চুপ কর বুড়ো! জলদি ওটা দে!” দ্বিতীয় লোকটা গর্জে উঠে এক পা এগিয়ে এল।
ঠিক এই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিল আদি। কারণ, তার গলায় ঝুলছিল ভারী প্রফেশনাল ক্যামেরাটা। সে দ্রুত ক্যামেরার ‘ফ্ল্যাশ গান’-এর পাওয়ার সর্বোচ্চ বাড়িয়ে দিল।
পরক্ষণেই, সে লোক দুটোর মুখ বরাবর ক্যামেরা তাক করে পরপর তিনবার শাটার টিপল।
ঝিলিক! ঝিলিক! ঝিলিক!
অন্ধকার ভাঙা ঘরের ভেতর তীব্র সাদা আলো জ্বলে উঠল। আকস্মিক এই আলোর ঝলকানিতে স্মাগলার দুজন সাময়িকভাবে অন্ধ হয়ে গেল। ফলস্বরূপ, একজন পিস্তল হাত থেকে ফেলে দিল।
“মামা, দৌড়াও!” আদি চিৎকার করে উঠল।
অতএব, মামা এক সেকেন্ডও নষ্ট করলেন না। তিনি তাম্রলিপিটা বুকের সাথে চেপে ধরে আদির পেছনে ছুটলেন। যেহেতু পানাম নগরের অলিগলি মামার মুখস্থ, তাই তারা দ্রুত বের হয়ে গেলেন।
রাস্তায় তাদের পরিচিত সিএনজি অটোরিকশাটি দাঁড়িয়ে ছিল। আদি আর মামা লাফিয়ে ওতে উঠতেই চালক রফিক ভাই জেরে টান দিলেন। ফলে, সিএনজি ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটে চলল।
বিকেলের দিকে তারা ঢাকার উত্তরায় মামার বাসায় পৌঁছালেন। তখন আদি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
টেবিলের ওপর রাখা হয়েছে সেই রহস্যময় তামার পাত। মামা ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ওটার ওপর খোদাই করা ধাঁধাটি আবার পড়লেন:
“যেখানে সূর্য ডোবে না কিন্তু ছায়া দীর্ঘ হয়,
তিন সিংহের পায়ের নিচে লুকিয়ে আছে অন্ধকারের আলো।”
আদি এক গ্লাস পানি খেয়ে বলল, “মামা, ‘যেখানে সূর্য ডোবে না’—এর মানে কী? এমন কোনো জায়গা কি বাংলাদেশে আছে?”
মামা চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে রহস্যময় হাসলেন। “ভৌগোলিক কোনো জায়গা নয় আদি, এটি আসলে একটি রূপক। মোগল আমলে একটি কথা প্রচলিত ছিল—মোগল সাম্রাজ্যে কখনো সূর্য ডোবে না।”
“আর তিন সিংহ?” আদি ভ্রু কুঁচকে ভাবল। “তিনটি সিংহের মূর্তি কোথায় আছে মামা?”
“সোনারগাঁওয়ের কাছেই একটি ঐতিহাসিক দুর্গ আছে, নাম ‘হাজীগঞ্জ দুর্গ’। ঈসা খাঁর আমলের দুর্গ,” মামা ডায়েরিতে কিছু একটা নোট করতে করতে বললেন। “ওখানকার প্রবেশদ্বারের ওপর প্রাচীন তিনটি সিংহের খোদাই করা মূর্তি ছিল।”
আদি সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। “তার মানে আমাদের আবার সোনারগাঁও ফিরতে হবে? কিন্তু স্মাগলাররা তো ওখানে পাহারা দিচ্ছে!”
“ওরা পাহারা দিচ্ছে পানাম নগরে, হাজীগঞ্জ দুর্গে নয়,” মামা মুচকি হাসলেন। “আজ রাতেই আমরা বের হব। যখন পুরো পৃথিবী ঘুমাবে, আমরা তিন সিংহের পায়ের নিচে অন্ধকারের আলো খুঁজব।”
রাত ১২টা।
নিঝুম হাজীগঞ্জ দুর্গের ভাঙা প্রাচীর বেয়ে আদি আর মামা ভেতরে ঢুকলেন। চারপাশ তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল। শুধু মেঘের আড়াল থেকে বের হওয়া চাঁদের আলোয় দুর্গের জরাজীর্ণ তিনটি সিংহের মূর্তি আবছা দেখা যাচ্ছিল।
মামা পকেট থেকে টর্চ বের করে সিংহের পায়ের নিচের মাটিতে আলো ফেললেন। অন্যদিকে, আদি সাবধানে চারপাশ দেখছিল। আচমকা তার পায়ের নিচে একটি শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ হলো।
না, ওটা কোনো ডাল ছিল না! আদি টর্চের আলো নিচে ফেলতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল।
মাটিতে পড়ে আছে একটি হাতকাটা কালো শার্ট। তাছাড়া, একটু দূরেই অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে দুটি চোখ। সেই শকুনের ট্যাটুওয়ালা লোকটা দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে।
লোকটার হাতে একটি চকচকে ধারালো ছুরি রয়েছে!
তাহলে কি স্মাগলাররা ইতিমধ্যেই দুর্গের ভেতরে ওত পেতে ছিল? আদি আর মামা কি এবার আর পালাতে পারবে?
(জানতে হলে চোখ রাখুন ৩য় পর্বে!)









