ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কার, পর্ব ৩

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কার

কলম্বাসের নতুন পৃথিবী আবিষ্কার: ভূমির দেখা, ঐতিহাসিক ভুল এবং এক নতুন যুগের সূচনা

  দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে উত্তাল আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার পর কলম্বাসের অভিযাত্রী দল প্রায় আশাহীন হয়ে পড়েছিল। নাবিকদের দেওয়া তিন দিনের সময়সীমাও শেষের পথে। তাই সবার চোখ ছিল দিগন্তে। তারা অপেক্ষা করছিল এমন একটি দৃশ্যের জন্য, যা হয়তো তাদের জীবন বাঁচাবে কিংবা চিরতরে ইতিহাসের অংশ করে তুলবে।

অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবরের ভোরে এক চিৎকার বদলে দেয় বিশ্বের ইতিহাস।

ভূমির প্রথম ইঙ্গিত

১১ অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে সমুদ্রে ভাসতে দেখা যায় একটি পাতাযুক্ত গাছের ডাল। পাশাপাশি মানুষের তৈরি বলে মনে হয় এমন একটি কাঠের লাঠিও চোখে পড়ে।

এই ছোট ছোট লক্ষণগুলো নাবিকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে।

তারা বুঝতে পারেন, স্থলভাগ আর খুব বেশি দূরে নয়।

ফলে দীর্ঘদিনের হতাশার জায়গায় আবারও আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।

“তিয়েরা! তিয়েরা!”—ইতিহাসের সেই মুহূর্ত

১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর। রাত তখন আনুমানিক দুইটা।

পিন্তা জাহাজটি অন্য দুটি জাহাজের তুলনায় কিছুটা সামনে ছিল।

হঠাৎ সাধারণ নাবিক রদ্রিগো দে ত্রিয়ানা (Rodrigo de Triana) চাঁদের আলোয় দূরে একটি বালুকাময় তটরেখা দেখতে পান।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে ওঠেন,

“¡Tierra! ¡Tierra!” অর্থাৎ “ভূমি! ভূমি!”

মুহূর্তেই তিনটি জাহাজে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়।

দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর অবশেষে তারা স্থলভাগের দেখা পেয়েছিলেন।

পরদিন সকালে কলম্বাস তাঁর প্রধান কর্মকর্তাদের নিয়ে ছোট নৌকায় তীরে অবতরণ করেন।

সান সালভাদর: নতুন ভূমিতে প্রথম পদার্পণ

কলম্বাস যে দ্বীপে পৌঁছেছিলেন, সেটি বর্তমান বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটি অংশ।

স্থানীয় তাইনো জনগণ এই দ্বীপের নাম রেখেছিল গুয়ানাহানি (Guanahani)।

তবে কলম্বাস স্পেনের রাজপরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে এর নতুন নাম দেন সান সালভাদর (San Salvador)।

এই ঘটনাই ইউরোপীয় অভিযানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ভুল নতুন ভূমিতে পৌঁছেও কলম্বাস নিজের ভুল বুঝতে পারেননি।

বরং তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, তিনি এশিয়ার কাছাকাছি কোনো দ্বীপে পৌঁছেছেন।

তাঁর ধারণা ছিল, এটি ইন্ডিজ অঞ্চলের অংশ। এই ভুল বিশ্বাস থেকেই তিনি স্থানীয় অধিবাসীদের “ইন্ডিয়ান” (Indian) নামে ডাকতে শুরু করেন।

পরবর্তীকালে এই নাম আমেরিকান ইন্ডিয়ান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বাস্তবে তিনি এশিয়ায় নয়, সম্পূর্ণ অজানা এক মহাদেশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিলেন। এই ভুল ধারণা তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়নি।

তাইনো জনগণের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ

দ্বীপের বাসিন্দারা ছিলেন তাইনো (Taíno) সম্প্রদায়ের মানুষ।

তারা অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় এবং অতিথিপরায়ণ ছিলেন।

অনেকেই সাঁতার কেটে জাহাজের কাছে চলে আসেন।

তারা তোতা পাখি, তুলার তৈরি সামগ্রী এবং বিভিন্ন উপহার নিয়ে আসেন। বিনিময়ে ইউরোপীয়রাও কিছু সামগ্রী প্রদান করেন।

প্রথম সাক্ষাৎটি ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ এবং কৌতূহলে ভরা। সোনার লোভ নতুন অভিযানের পথ খুলে দেয়

কলম্বাস খুব দ্রুত একটি বিষয় লক্ষ্য করেন। কিছু তাইনো মানুষের কানে ও নাকে ছোট ছোট সোনার অলংকার ছিল।

এই দৃশ্য তাঁর মনে নতুন আশার পাশাপাশি প্রবল লোভও সৃষ্টি করে।

তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, আশেপাশের কোথাও নিশ্চয়ই বড় সোনার ভাণ্ডার রয়েছে।

ফলে তিনি বাহামা ছেড়ে কিউবা এবং পরে হিস্পানিওলা দ্বীপের দিকে যাত্রা করেন।

বর্তমানে হিস্পানিওলা দ্বীপটি হাইতি এবং ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে বিভক্ত।

সান্তা মারিয়ার করুণ পরিণতি

১৪৯২ সালের বড়দিনের রাতে একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে।

কলম্বাসের প্রধান জাহাজ সান্তা মারিয়া একটি পাথুরে চরে আটকে যায়।

অনেক চেষ্টা করেও জাহাজটিকে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

অবশেষে সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।

স্থানীয় আদিবাসী প্রধানের সহযোগিতায় জাহাজের কাঠ ব্যবহার করে একটি ছোট দুর্গ নির্মাণ করা হয়।

এই দুর্গের নাম রাখা হয় লা নাভিদাদ (La Navidad)।

কেন ৩৯ জন নাবিককে রেখে যেতে হয়েছিল?

সান্তা মারিয়া ধ্বংস হওয়ার পর মাত্র দুটি ছোট জাহাজ অবশিষ্ট ছিল।

ফলে সব নাবিককে একসঙ্গে স্পেনে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না।

এই কারণে কলম্বাস ৩৯ জন নাবিককে লা নাভিদাদ দুর্গে রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তাদের দায়িত্ব ছিল দুর্গ রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

এই সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে নানা জটিল ঘটনার জন্ম দেয়।

স্পেনে বীরের প্রত্যাবর্তন

১৪৯৩ সালের জানুয়ারিতে কলম্বাস নিনিয়া জাহাজে করে স্পেনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।

সঙ্গে ছিল সামান্য সোনা, অজানা উদ্ভিদ, রঙিন তোতা পাখি এবং জোরপূর্বক বন্দি করা কয়েকজন তাইনো মানুষ।

দীর্ঘ যাত্রা শেষে তিনি স্পেনে ফিরে আসেন।

রাজা ফার্দিনান্দ এবং রানি ইসাবেলা তাঁকে বীরের সম্মান দেন।

তাঁর অভিযানের সাফল্যে রাজদরবার অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়। ফলে তাঁকে আরও বড় অভিযানের জন্য অর্থ এবং অনুমতি দেওয়া হয়।

কলম্বাসের শেষ পর্যন্ত অজানা থেকে যাওয়া সত্য

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কলম্বাস কখনোই বুঝতে পারেননি তিনি কোথায় পৌঁছেছিলেন।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি এশিয়ার উপকূলে পৌঁছেছিলেন।

বাস্তবে তাঁর যাত্রা ইউরোপের সামনে সম্পূর্ণ নতুন একটি মহাদেশের দরজা খুলে দেয়।

এই ঘটনাই পরবর্তী শতাব্দীতে বিশ্ব রাজনীতি, বাণিজ্য, উপনিবেশ বিস্তার এবং মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।

উপসংহার

কলম্বাসের নতুন ভূমিতে পৌঁছানো মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এটি শুধু এক আবিষ্কারের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভুল ধারণা, সাহস, কৌতূহল, লোভ এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বের রূপান্তরের সূচনা।

তিনি ভেবেছিলেন এশিয়ায় পৌঁছেছেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁর যাত্রা ইউরোপকে পরিচয় করিয়ে দেয় এক সম্পূর্ণ নতুন পৃথিবীর সঙ্গে।

আজও ইতিহাসের এই অধ্যায় একই সঙ্গে বিস্ময়, বিতর্ক এবং শিক্ষার উৎস হয়ে রয়েছে।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading