ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কার, পার্ব ১

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কার

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের পশ্চিমমুখী সমুদ্রযাত্রার স্বপ্ন: এক অসম্ভব পরিকল্পনার শুরু

  ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত পুরো পৃথিবীর গতিপথ বদলে দিয়েছে। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের পশ্চিমমুখী সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা তেমনই একটি ঘটনা। প্রথমে এটি অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হয়েছিল। তবুও সেই স্বপ্নই পরে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে পরিণত হয়।

তবে এই গল্প কেবল একজন নাবিকের নয়। এটি ইউরোপের বাণিজ্য, রাজনীতি, সাহস এবং ভুল হিসাবেরও গল্প। সেই কারণেই আজও কলম্বাসের পরিকল্পনা ইতিহাসবিদদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

কেন ইউরোপ এশিয়ার নতুন সমুদ্রপথ খুঁজছিল?

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপে এশিয়ার বিলাসবহুল পণ্যের চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া। চীন থেকে আসত সূক্ষ্ম রেশম। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসত দারুচিনি, গোলমরিচ, লবঙ্গ এবং অন্যান্য মূল্যবান মসলা। এছাড়া চীনের চীনামাটির বাসনও ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

কিন্তু এসব পণ্য ইউরোপে পৌঁছাতে হতো দীর্ঘ স্থলপথ ধরে। এই পথই ইতিহাসে সিল্ক রোড নামে পরিচিত।

১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল পতনের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কর বেড়ে যায়। ফলে এশিয়ার পণ্য ইউরোপে পৌঁছাতে খরচ অনেক বেশি পড়তে শুরু করে।

ফলস্বরূপ ইউরোপের রাজারা নতুন সমুদ্রপথ খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। তারা এমন একটি পথ চেয়েছিলেন, যেখানে মধ্যস্থতাকারীদের উপর নির্ভর করতে হবে না।

পর্তুগালের পরিকল্পনা এবং কলম্বাসের ভিন্ন চিন্তা

সে সময় পর্তুগালের নাবিকেরা আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করে সরাসরি ভারতে পৌঁছানো।

অন্যদিকে ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা নিয়ে এগিয়ে এলেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা করলেই অল্প সময়ে জাপান ও চীনে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

এই পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সাহসী। একই সঙ্গে এটি ছিল প্রচলিত ধারণার বাইরে।

কলম্বাসের বড় ধারণা

অনেকেই মনে করেন, কলম্বাস পৃথিবী গোল প্রমাণ করতে সমুদ্রে নেমেছিলেন। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন।

সে সময়ের শিক্ষিত মানুষরা ইতোমধ্যেই জানতেন পৃথিবী গোলাকার।

কলম্বাসের মূল ধারণা ছিল পৃথিবীর আকার নিয়ে। তিনি মনে করতেন পৃথিবীর পরিধি বাস্তবের তুলনায় অনেক ছোট। পাশাপাশি তিনি বিশ্বাস করতেন এশিয়া আরও অনেক পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই দুই ধারণা মিলিয়ে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে পশ্চিম দিকে কয়েক সপ্তাহ নৌযাত্রা করলেই এশিয়ায় পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

কোথায় ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল?

কলম্বাসের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল ভুল গণনা।

তিনি পৃথিবীর প্রকৃত পরিধি অনেক কম ধরে হিসাব করেছিলেন। আরও বড় বিষয় হলো, তিনি জানতেনই না যে আটলান্টিকের ওপারে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা নামে বিশাল দুটি মহাদেশ রয়েছে।

অর্থাৎ তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।

তবুও তাঁর আত্মবিশ্বাস এতটাই দৃঢ় ছিল যে তিনি নিজের ধারণা থেকে একবারও সরে আসেননি।

অর্থের জন্য শুরু হলো দীর্ঘ সংগ্রাম

একটি সমুদ্র অভিযান পরিচালনা করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল। তাই কলম্বাস ইউরোপের বিভিন্ন রাজদরবারে সমর্থনের জন্য ঘুরে বেড়াতে থাকেন।

তিনি তাঁর পরিকল্পনার নাম দিয়েছিলেন “এন্টারপ্রাইজ অব দ্য ইন্ডিজ”।

কিন্তু সবাই তাঁর প্রস্তাবে বিশ্বাস করেননি।

পর্তুগালের প্রত্যাখ্যান

প্রথমে তিনি পর্তুগালের রাজা জন দ্বিতীয়ের কাছে যান।

রাজকীয় বিশেষজ্ঞরা তাঁর হিসাব পরীক্ষা করেন। এরপর তারা বুঝতে পারেন যে পৃথিবীর আকার নিয়ে কলম্বাসের ধারণা অত্যন্ত ভুল।

ফলে পর্তুগাল তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের নীরবতা

পরবর্তীতে তিনি ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের কাছেও প্রস্তাব পাঠান।

কিন্তু দুই দেশই সেই সময় তাঁর অভিযানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখায়নি।

তাই আবারও তাঁকে হতাশ হতে হয়।

অবশেষে স্পেনের দরবারে আশার আলো

১৪৮৬ সালে কলম্বাস স্পেনের রানি ইসাবেলা প্রথম এবং রাজা ফার্দিনান্দ দ্বিতীয়ের সামনে তাঁর পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

তবে সঙ্গে সঙ্গে অনুমতি মেলেনি।

প্রায় ছয় বছর ধরে স্পেনের রাজদম্পতি তাঁকে অপেক্ষায় রাখেন। কারণ তখন তারা নিজেদের যুদ্ধ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।

কলম্বাস প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি ফ্রান্সে চলে যাওয়ার কথাও ভাবছিলেন।

১৪৯২: ইতিহাস বদলে যাওয়ার বছর

১৪৯২ সালে স্পেন গ্রানাডা জয় করে দীর্ঘ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়।

এই বিজয়ের পর স্পেন নিজেদের সমুদ্র শক্তি বাড়াতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। পাশাপাশি তারা পর্তুগালের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে চেয়েছিল।

অবশেষে রানি ইসাবেলা কলম্বাসের অভিযানে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেন।

তাঁকে তিনটি জাহাজ, একটি নাবিক দল এবং সম্মানজনক “অ্যাডমিরাল অব দ্য ওশান সি” উপাধি প্রদান করা হয়।

সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সমুদ্র অভিযানের প্রস্তুতি।

উপসংহার

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের পরিকল্পনা ছিল সাহসী, ব্যতিক্রমী এবং একই সঙ্গে ভুল হিসাবের উপর দাঁড়ানো। তবুও তাঁর অদম্য আত্মবিশ্বাস তাঁকে বারবার ব্যর্থতার পরও এগিয়ে যেতে শিখিয়েছিল।

অবশেষে স্পেনের সমর্থন তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়। এরপর শুরু হয় এমন এক যাত্রা, যা শুধু তাঁর জীবনই নয়, পুরো বিশ্বের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়।

এই লেখাটি ছিল কলম্বাসের অভিযানের প্রথম অধ্যায়। পরবর্তী পর্বে আমরা জানব তাঁর ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রা, তিনটি জাহাজের গল্প এবং কীভাবে তিনি অজান্তেই নতুন এক মহাদেশের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading