বাংলাদেশে শকুন হারিয়ে যাচ্ছে কেন? কারণ, প্রভাব ও করণীয়

বাংলাদেশে  শকুন  হারিয়ে  যাচ্ছে কেন? 

  এক সময় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বিকেলের আকাশে কয়েকটি শকুনকে ভেসে বেড়াতে দেখা ছিল খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। মাঠের পাশে কিংবা বড় কোনো বটগাছের ডালে তারা নিশ্চুপ বসে থাকত। তখন মানুষ তাদের উপস্থিতিকে খুব একটা গুরুত্ব দিত না। কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন অনেক তরুণ এমনও আছে, যারা বাস্তবে কখনও শকুন দেখেনি।

শকুনকে অনেকেই অপছন্দের পাখি মনে করেন। কারণ এটি মৃত প্রাণীর দেহ খায়। অথচ প্রকৃতির দৃষ্টিতে এটাই তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রকৃতি প্রতিটি প্রাণীকেই একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে। শকুন সেই দায়িত্ব পালন করে নীরবে, কোনো প্রতিদান না চেয়ে।

আজ এই উপকারী পাখিটিই বাংলাদেশে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শকুনকে শুধু বইয়ের পাতায় বা ছবিতে দেখবে।

শকুন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলা হয় শকুনকে। কোনো গবাদিপশু বা বন্য প্রাণী মারা গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শকুন সেই মৃতদেহ খেয়ে ফেলে। এতে পরিবেশ দীর্ঘ সময় দূষিত থাকে না।

মৃত প্রাণীর দেহ অনেক ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর জন্ম দেয়। এগুলো থেকে অ্যানথ্রাক্স, কলেরা এবং আরও নানা রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। শকুন দ্রুত মৃতদেহ সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে এসব রোগের বিস্তার অনেকটাই কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ শকুন শুধু একটি পাখি নয়, এটি প্রকৃতির স্বাস্থ্যব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের শকুন?

শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি কারণ সবচেয়ে বেশি দায়ী।

১. ক্ষতিকর পশু-চিকিৎসার ওষুধ

বিশেষজ্ঞদের মতে, শকুন বিলুপ্তির সবচেয়ে বড় কারণ হলো গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ।

এই ওষুধ দেওয়া কোনো গরু বা মহিষ মারা গেলে শকুন সেই মৃতদেহ খায়। কিন্তু ওষুধের বিষক্রিয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের কিডনি বিকল হয়ে যায়। ফলে একসঙ্গে অনেক শকুন মারা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণও এটিই।

২. বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া

শকুন সাধারণত বিশাল আকৃতির পুরোনো গাছে বাসা বাঁধে। কিন্তু নগরায়ন, বন উজাড় এবং নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে এসব গাছ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

নিরাপদ বাসা না থাকলে শকুনের প্রজননও ব্যাহত হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের সংখ্যা ক্রমেই কমতে থাকে।

৩. নিরাপদ খাদ্যের অভাব

আগের দিনে গ্রামে মৃত গবাদিপশু খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হতো। এখন স্বাস্থ্যবিধি ও অন্যান্য কারণে সেই চিত্র অনেক বদলে গেছে।

এটি পরিবেশের জন্য ভালো হলেও শকুনের জন্য নিরাপদ খাদ্যের উৎস কমে গেছে। ফলে অনেক এলাকায় তারা পর্যাপ্ত খাবার খুঁজে পায় না।

৪. বিষপ্রয়োগ

অনেক সময় শিয়াল, বন্য কুকুর কিংবা অন্য প্রাণী মারার জন্য বিষ মেশানো মৃত প্রাণী ফেলে রাখা হয়। শকুন সেই মৃতদেহ খেয়ে নিজেরাও বিষক্রিয়ায় মারা যায়।

একটি বিষাক্ত মৃতদেহ কখনও কখনও একসঙ্গে বহু শকুনের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।

৫. ধীর প্রজনন

শকুন খুব ধীরে বংশবিস্তার করে। সাধারণত বছরে একটি মাত্র ডিম দেয়।

ফলে কোনো কারণে প্রাপ্তবয়স্ক শকুন মারা গেলে সেই ক্ষতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হয় না। এ কারণেও তাদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে না।

শকুন হারিয়ে গেলে কী হতে পারে?

অনেকে ভাবেন, একটি পাখি কমে গেলে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।

শকুন না থাকলে মৃত প্রাণীর দেহ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকবে। এতে দুর্গন্ধ বাড়বে এবং ক্ষতিকর জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ভবঘুরে কুকুর, শিয়াল এবং অন্যান্য মৃতভোজী প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়বে।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

শকুন রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার, বন বিভাগ এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন কয়েক বছর ধরে কাজ করছে।

এর অংশ হিসেবে ডাইক্লোফেনাক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। নিরাপদ বিকল্প হিসেবে মেলোক্সিক্যাম ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। দেশের কয়েকটি এলাকাকে Vulture Safe Zone হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে শকুনের নিরাপদ আবাস ও খাদ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

এ ছাড়া উদ্ধার কার্যক্রম, গবেষণা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শকুনের প্রজনন পর্যবেক্ষণও অব্যাহত রয়েছে।

আমাদের কী করা উচিত?

শুধু সরকারের উদ্যোগে শকুনকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের উচিত—

গবাদিপশুর চিকিৎসায় শকুনের জন্য ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার না করা।
বড় ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণ করা।
বিষ দিয়ে প্রাণী হত্যার প্রবণতা বন্ধ করা।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আইন মেনে চলা।
শিশু ও তরুণদের পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করা।
শকুন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা।
শেষ কথা

শকুন দেখতে হয়তো অন্য অনেক পাখির মতো সুন্দর নয়। কিন্তু প্রকৃতির কাছে সৌন্দর্যের চেয়ে দায়িত্ব অনেক বড়। সেই দায়িত্ব শকুন শত শত বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এসেছে।

আজ যদি আমরা এই পাখিটিকে হারিয়ে ফেলি, তাহলে ক্ষতি হবে শুধু একটি প্রজাতির নয়; ক্ষতি হবে পুরো পরিবেশের। তাই শকুনকে রক্ষা করা মানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা, নিজেদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।

হয়তো আবার কোনো এক বিকেলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াবে শকুনের দল। সেই দৃশ্য ফিরে আসুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading