ভূমিকম্প হলে অনেক সময় দেখা যায়, উৎপত্তিস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরের এলাকাতেও মাটি কেঁপে ওঠে। অথচ সেখানে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়নি। তাহলে এত দূরের মানুষও কম্পন অনুভব করেন কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ভেতরে চলাচল করা ভূকম্পীয় তরঙ্গের মধ্যে। পৃথিবীর উপরিভাগ আমাদের কাছে শক্ত মনে হলেও এর ভেতরে রয়েছে নানা ধরনের শিলা ও স্তর। ভূমিকম্পের সময় তৈরি হওয়া শক্তি এই শিলাগুলোর মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাই উৎপত্তিস্থল থেকে অনেক দূরেও মাটি কেঁপে উঠতে পারে।
চলুন, সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক কীভাবে ভূমিকম্পের কম্পন এত দূরে পৌঁছে যায়।

ভূমিকম্প কীভাবে শুরু হয়?
পৃথিবীর বাইরের শক্ত স্তরটি কয়েকটি বড় ও ছোট টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো খুব ধীরে ধীরে চলতে থাকে। তবে চলার পথে কখনো কখনো তারা একে অপরের সঙ্গে আটকে যায়।
এভাবে আটকে থাকার কারণে শিলার মধ্যে ধীরে ধীরে চাপ জমতে থাকে। একসময় সেই চাপ শিলার সহ্যক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। তখন শিলার ফাটল বরাবর হঠাৎ সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর ফলে জমে থাকা শক্তির একটি অংশ ভূকম্পীয় তরঙ্গ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
আমরা এই শক্তির প্রভাবই ভূমিকম্প হিসেবে অনুভব করি।
ভূগর্ভের যে স্থানে শিলার ভাঙন বা সরে যাওয়া শুরু হয়, তাকে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বলে। আর সেই স্থানের ঠিক ওপরের ভূপৃষ্ঠের বিন্দুটিকে বলা হয় উপকেন্দ্র।
ভূমিকম্পের কম্পন এত দূরে পৌঁছায় কীভাবে?
ভূমিকম্পের সময় উৎপন্ন শক্তি ভূকম্পীয় তরঙ্গের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এই তরঙ্গ পৃথিবীর অভ্যন্তর দিয়ে চলতে পারে। কিছু তরঙ্গ আবার ভূপৃষ্ঠ বরাবর ছড়িয়ে পড়ে।
বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য একটি পুকুরের কথা ভাবুন। শান্ত পানিতে একটি পাথর ফেললে চারদিকে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। পাথরটি যেখানে পড়েছে, ঢেউ কিন্তু শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
ভূমিকম্পের ক্ষেত্রেও কিছুটা একই ঘটনা ঘটে। তবে এখানে পানির ঢেউ নয়, শিলার মধ্যে শক্তির চলাচল ঘটে।
ভূগর্ভের শিলার মধ্য দিয়ে এই শক্তি অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে শত শত, এমনকি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হতে পারে।
তবে সব ভূকম্পীয় তরঙ্গ একই গতিতে চলে না। পৃথিবীর অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের গতি ও চলার পথও বদলে যেতে পারে।
ভূমিকম্পের তরঙ্গ কত ধরনের?
ভূমিকম্পের কম্পন ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তিন ধরনের তরঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. প্রাথমিক তরঙ্গ বা পি-ওয়েভ
পি-ওয়েভ সাধারণত ভূমিকম্পের সময় তৈরি হওয়া তরঙ্গগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতির। তাই এটি সবার আগে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছায়।
এই তরঙ্গের কারণে শিলা তরঙ্গ চলার দিক বরাবর সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এটি কঠিন পদার্থ, তরল এবং গ্যাসের মধ্য দিয়েও চলতে পারে।
পি-ওয়েভের গতি ও চলার পথ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান।
২. গৌণ তরঙ্গ বা এস-ওয়েভ
এস-ওয়েভ সাধারণত পি-ওয়েভের পরে পৌঁছায়। এই তরঙ্গ শিলাকে তরঙ্গ চলার দিকের আড়াআড়ি নাড়িয়ে দেয়।
এস-ওয়েভ কঠিন পদার্থের মধ্য দিয়ে চলতে পারে, কিন্তু তরলের মধ্য দিয়ে চলতে পারে না। পৃথিবীর বাইরের কেন্দ্রের তরল অবস্থার প্রমাণ বুঝতে এই বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
৩. ভূপৃষ্ঠীয় তরঙ্গ
ভূপৃষ্ঠীয় তরঙ্গ পৃথিবীর উপরিভাগ বরাবর ছড়িয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে এই তরঙ্গ দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী কম্পন তৈরি করে।
এর প্রভাবে বাড়িঘর, সেতু এবং অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে বড় ভূমিকম্পে ভূপৃষ্ঠীয় তরঙ্গের প্রভাব অনেক দূরের এলাকাতেও অনুভূত হতে পারে।
দূরের এলাকায় কখনো বেশি কম্পন অনুভূত হয় কেন?
সাধারণত ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় কম্পন বেশি শক্তিশালী হয়। কিন্তু সব সময় এমনটি ঘটে না। কখনো দূরের কোনো এলাকায়ও উল্লেখযোগ্য কম্পন অনুভূত হতে পারে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
মাটির ধরন: নরম পলিমাটি ও ভরাট জমি অনেক ক্ষেত্রে ভূকম্পীয় কম্পন বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, শক্ত শিলার ওপর কম্পনের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
ভূমিকম্পের গভীরতা: ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল কতটা গভীরে, তার ওপর ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানো কম্পনের ধরন ও তীব্রতা নির্ভর করে।
ভূমিকম্পের শক্তি: বড় ভূমিকম্পে বেশি শক্তি নির্গত হয়। ফলে এর তরঙ্গ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ভূগর্ভের গঠন: পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরে শিলার বৈশিষ্ট্য আলাদা। তাই ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতি ও চলার পথও পরিবর্তিত হতে পারে।
এই কারণেই শুধু উপকেন্দ্র থেকে দূরত্ব হিসাব করে কোনো এলাকার ক্ষয়ক্ষতি কতটা হবে, তা নির্ধারণ করা যায় না।
ভূমিকম্পের সময় কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?
ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিরাপদ অবস্থান নেওয়া জরুরি। কয়েকটি সহজ অভ্যাস বিপদের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
- ঘরের ভেতরে থাকলে মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন।
- মাথা ও ঘাড় হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন এবং আশ্রয়স্থল ধরে থাকুন।
- জানালা, কাচ ও ভারী আসবাব থেকে দূরে থাকুন।
- কম্পন চলাকালে সিঁড়ি বা লিফটের দিকে দৌড়াবেন না।
- বাইরে থাকলে ভবন, বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য বিপজ্জনক বস্তু থেকে দূরে খোলা জায়গায় থাকার চেষ্টা করুন।
- কম্পন থেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এড়িয়ে চলুন এবং স্থানীয় জরুরি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভূমিকম্পের সঠিক সময়, স্থান ও মাত্রা নির্ভুলভাবে আগাম বলতে পারেন না। তবে সতর্কতা, প্রস্তুতি এবং সঠিক তথ্য বিপদের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
শেষ কথা
ভূমিকম্পের কম্পন দূরবর্তী এলাকায় পৌঁছানোর মূল কারণ হলো ভূকম্পীয় তরঙ্গের মাধ্যমে শক্তির বিস্তার। পৃথিবীর অভ্যন্তরের শিলা এবং ভূপৃষ্ঠের মধ্য দিয়ে এই তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে উৎপত্তিস্থল থেকে অনেক দূরেও মানুষ মাটির কম্পন অনুভব করতে পারেন।
তবে কোথায় কম্পন কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করে ভূমিকম্পের মাত্রা, গভীরতা, দূরত্ব এবং স্থানীয় মাটির বৈশিষ্ট্যের ওপর।
পৃথিবীর এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা শুধু আমাদের কৌতূহল মেটায় না। বরং ভূমিকম্পের ঝুঁকি বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।




