কুয়াশায় মোড়া শীতের সকাল
বাংলার গ্রামে শীতের পিঠা মানেই এক অন্যরকম অনুভূতি। ভোরের কুয়াশা তখন চারপাশ ঢেকে রাখে। শিশিরে ভেজা মাটির পথ থাকে একেবারে নীরব।
দূরে তালগাছের মাথাও স্পষ্ট দেখা যায় না। তবে কোনো কোনো বাড়ি থেকে ধোঁয়া উঠতে থাকে। সেই ধোঁয়ার সঙ্গে ভেসে আসে পিঠার মিষ্টি গন্ধ।
এমনই একটি শীতের সকাল শুরু হয়েছিল আবদুল করিমের পরিবারে। করিম একজন ক্ষুদ্র কৃষক। নিজের মাত্র আধা বিঘা জমি আছে। পাশাপাশি তিনি অন্যের জমিও বর্গা নিয়ে চাষ করেন।
সারা বছর পরিশ্রম করেও সংসারে স্বচ্ছলতা আসে না। তবুও পরিবারের ছোট ছোট আনন্দগুলো তিনি ধরে রাখেন।
অভাবের সংসারে পিঠার আয়োজন
করিমের স্ত্রী রহিমা ভোরেই ঘুম থেকে ওঠেন। উঠোনের এক পাশে তখন মাটির চুলায় আগুন জ্বলছে।
শুকনো খড় আর ধানের তুষ দিয়ে তিনি আগুন ধরান। শীতের কারণে তাঁর হাত ঠান্ডায় জমে আসে। তবুও তিনি কাজ থামান না।
কারণ আজ বাড়িতে পিঠা হবে।
আগের দিন রহিমা পাশের বাড়ি থেকে সামান্য চাল ধার করেছিলেন। নিজের উঠোনের নারকেল গাছ থেকেও একটি নারকেল সংগ্রহ করেছিলেন।
খেজুরের গুড়ও ছিল অল্প। সেটিও গ্রামের পরিচিত একজনের কাছ থেকে ধার করা।
তবুও এসব নিয়ে তাঁর কোনো আফসোস নেই। বরং সন্তানদের মুখে হাসি দেখাই তাঁর কাছে বড় আনন্দ।
দাদির হাতে তৈরি পিঠার স্বাদ
রহিমার পাশে বসে ছিলেন করিমের বৃদ্ধ মা। নাতি-নাতনিদের কাছে তিনি শুধু দাদি।
বয়সের ভারে তাঁর হাত কাঁপে। হাঁটতেও এখন কষ্ট হয়। তবে পিঠা বানানোর পুরোনো অভ্যাস এখনও আছে।
রহিমা চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠার মণ্ড তৈরি করেন। এরপর নারকেল ও গুড় দিয়ে পুর তৈরি করেন।
দাদি ধীরে ধীরে পিঠার আকার ঠিক করে দেন। পাশে বসে থাকা শিশুরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।
কিছুক্ষণ পর মাটির চুলায় ভাপা পিঠা বসে যায়। পাত্রের ঢাকনা খুলতেই গরম ধোঁয়া বের হয়।
সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে নারকেল আর খেজুরের গুড়ের মিষ্টি গন্ধ।
দাদি একটি গরম পিঠা নাতির হাতে তুলে দেন। শিশুটি পিঠায় ফুঁ দিয়ে ছোট্ট কামড় দেয়।
তার মুখের হাসিই যেন পুরো বাড়ির আনন্দ হয়ে ওঠে।
কৃষকের জীবনে শীতের আরেক সকাল
পিঠা খাওয়ার পর করিম মাঠের দিকে রওনা হন। কুয়াশায় তখন গ্রামের পথ প্রায় অদৃশ্য।
পায়ের নিচে শিশিরভেজা মাটি। কাঁধে কৃষিকাজের সরঞ্জাম। সামনে আবার দীর্ঘ কর্মদিবস।
করিমের মতো আরও অনেক কৃষক একই পথে হাঁটছেন। কারও হাতে কোদাল আছে। আবার কারও হাতে বীজের বস্তা।
শীত তাদের কাজ থামাতে পারে না। কারণ মাঠের ফসলের ওপরই পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।
অভাবের জীবন হলেও তাদের স্বপ্ন থেমে থাকে না। বরং প্রতিদিনের পরিশ্রম সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে।
মাঠের আইলে পিঠা ভাগাভাগি
দুপুরের দিকে করিম মাঠের এক পাশে বসেন। স্ত্রী সকালে তাঁর জন্য দুটি পিঠা কাপড়ে জড়িয়ে দিয়েছিলেন।
পাশে বসা আরেক কৃষক পিঠা দেখে হাসলেন।
তিনি বললেন, “আজ বুঝি বাড়িতে পিঠা হয়েছে?”
করিমও হেসে একটি পিঠা তাঁর হাতে তুলে দেন।
গ্রামের মানুষের এই ছোট্ট ভাগাভাগি খুব সাধারণ। তবে এর মধ্যেই রয়েছে গভীর মানবিকতা।
অভাবের মধ্যেও তারা খাবার ভাগ করে খেতে জানে। কারণ সম্পর্ক তাদের কাছে অর্থের চেয়ে মূল্যবান।
সন্ধ্যার চুলার পাশে দাদির গল্প
সন্ধ্যায় করিম কাজ শেষে বাড়ি ফেরেন। বাইরে তখন আবার ঠান্ডা বেড়ে গেছে।
সবাই মাটির চুলার পাশে বসে। আগুনের উষ্ণতায় জমে ওঠে পরিবারের গল্প।
দাদি তখন নিজের ছোটবেলার কথা বলতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, আগে শীতের সময় পুরো গ্রামের মানুষ একসঙ্গে পিঠা বানাত। কেউ চাল ভানত। কেউ নারকেল কুরাত।
আবার কেউ খেজুরের রস সংগ্রহ করত।
সেই সময় মানুষের অর্থ কম ছিল। তবে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গভীর।
প্রতিবেশীর বাড়িতে পিঠা পাঠানো ছিল স্বাভাবিক বিষয়। কারও বাড়িতে আনন্দ হলে সবাই সেই আনন্দে অংশ নিত।
গ্রামের পিঠা কেন এত বিশেষ?
শীতের পিঠা শুধু একটি খাবার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের অনেক স্মৃতি।
বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে পিঠা একটি ছোট উৎসবের মতো।
এর মধ্যে থাকে—
- পরিবারের প্রতি ভালোবাসা
- মায়ের নিঃস্বার্থ পরিশ্রম
- দাদির স্নেহ
- কৃষকের কঠোর পরিশ্রম
- প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগাভাগি
- গ্রামের পুরোনো ঐতিহ্য
- শৈশবের মধুর স্মৃতি
তাই শহরের দোকানে কেনা পিঠা আর ঘরের পিঠার অনুভূতি এক নয়।
বদলে যাচ্ছে গ্রামের সেই জীবন
সময়ের সঙ্গে গ্রামের জীবনও অনেক বদলে যাচ্ছে। এখন অনেক পরিবার বাজার থেকে পিঠা কিনে আনে।
অনেক বাড়িতে মাটির চুলাও নেই। খেজুরের রস সংগ্রহের পুরোনো রীতিও কমে যাচ্ছে।
তবুও কিছু পরিবার এখনও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
তাদের ঘরের শীতের সকাল এখনও কুয়াশায় শুরু হয়। চুলায় আগুন জ্বলে। পিঠার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
আর দাদির হাতের একটি গরম পিঠা নাতির শীত ভুলিয়ে দেয়।
শেষ কথা
গ্রামের দরিদ্র মানুষের জীবন সহজ নয়। প্রতিদিন তাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।
তবুও তারা ছোট আনন্দকে ভালোবাসতে জানে। একটি গরম পিঠাও তাদের কাছে উৎসবের কারণ হতে পারে।
তাই শীতের পিঠা শুধু চাল, নারকেল আর গুড়ের তৈরি খাবার নয়। এর সঙ্গে মিশে থাকে ভালোবাসা, পরিশ্রম এবং পারিবারিক বন্ধন।
কুয়াশায় ঢাকা সেই ভোর হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে। মাটির চুলার ধোঁয়াও হয়তো আর দেখা যাবে না।
তবুও দাদির হাতে বানানো সেই পিঠার স্মৃতি থেকে যাবে।
কারণ কিছু স্বাদ জিহ্বায় নয়, মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।









