সকালে ঘুম থেকে উঠে আকাশের দিকে তাকালে চোখে পড়ে এক বিশাল নীল চাদর। মেঘ না থাকলে আকাশ সাধারণত নীলই দেখা যায়। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, আকাশ নীল কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে সূর্যের আলো এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে। সূর্যের আলো দেখতে সাদা মনে হলেও এর মধ্যে বিভিন্ন রঙের আলো রয়েছে।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার পর এই আলোগুলো বাতাসের অতি ক্ষুদ্র কণার সঙ্গে ধাক্কা খায়। তখন আলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকেই বলা হয় আলোর বিচ্ছুরণ।

সূর্যের আলো কি সত্যিই সাদা?
হ্যাঁ, আমাদের চোখে সূর্যের আলো সাদা মনে হয়। তবে সেই সাদা আলোর মধ্যে বিভিন্ন রঙের আলো রয়েছে।
রংধনুর দিকে তাকালে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। সেখানে সূর্যের আলো বিভিন্ন রঙে ভাগ হয়ে যায়।
সাধারণভাবে দৃশ্যমান আলোর প্রধান রংগুলো হলো—
প্রতিটি রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা।
বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পর কী ঘটে?
সূর্যের আলো মহাকাশ পেরিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে।
বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনসহ বিভিন্ন গ্যাসের অণু রয়েছে।
সূর্যের আলো এসব অণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে আলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সব রঙ একই পরিমাণে ছড়িয়ে পড়ে না।
নীল আলো বেশি ছড়িয়ে পড়ে কেন?
নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল আলোর তুলনায় কম।
কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বায়ুমণ্ডলের ক্ষুদ্র অণুর মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
এই কারণে নীল আলো আকাশের বিভিন্ন দিকে বেশি ছড়িয়ে যায়।
আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে সেই ছড়িয়ে পড়া নীল আলো দেখতে পাই।
ফলে পরিষ্কার দিনে আমাদের চোখে পুরো আকাশ নীল দেখায়।
তাহলে বেগুনি আকাশ দেখি না কেন?
এটি বেশ মজার প্রশ্ন।
বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য নীলের চেয়েও কম। তাই বেগুনি আলো আরও বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবুও আমাদের চোখে আকাশ সাধারণত বেগুনি দেখায় না।
এর কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, সূর্যের আলোতে বেগুনি আলোর পরিমাণ তুলনামূলক কম। দ্বিতীয়ত, মানুষের চোখ নীল আলোর প্রতি বেগুনির তুলনায় বেশি সংবেদনশীল।
এ ছাড়া বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আলো যাওয়ার সময় অন্যান্য প্রক্রিয়াও প্রভাব ফেলে।
তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের চোখে আকাশের প্রধান রং হিসেবে নীলই ধরা পড়ে।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল হয় কেন?
দিনের মাঝামাঝি সূর্য যখন মাথার ওপর থাকে, তখন আলোকে বায়ুমণ্ডলের তুলনামূলক কম পথ অতিক্রম করতে হয়।
কিন্তু সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সূর্যের আলো অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে।
এই দীর্ঘ পথে নীল ও বেগুনি আলো বেশি ছড়িয়ে যায়।
ফলে সরাসরি আমাদের চোখে পৌঁছানো আলোতে লাল, কমলা ও হলুদ রঙের অংশ তুলনামূলক বেশি থাকে।
তাই ভোর ও সন্ধ্যার আকাশে লালচে বা কমলা রং দেখা যায়।
মেঘলা দিনে আকাশ সাদা বা ধূসর দেখায় কেন?
মেঘে অসংখ্য ক্ষুদ্র পানির ফোঁটা বা বরফের কণা থাকে।
এসব কণা বিভিন্ন রঙের আলোকে প্রায় সমানভাবে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দিতে পারে।
ফলে নীল রং আলাদা করে বেশি চোখে পড়ে না।
এই কারণে মেঘলা দিনে আকাশ অনেক সময় সাদা বা ধূসর দেখায়।
মহাকাশ থেকে আকাশ কেমন দেখায়?
মহাকাশে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর দিকে তাকালে আকাশকে আমাদের মতো নীল দেখার সুযোগ নেই।
কারণ মহাকাশে পৃথিবীর মতো ঘন বায়ুমণ্ডল নেই।
বায়ুমণ্ডল না থাকলে আলো ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও খুব কম হয়।
তাই মহাকাশচারীদের কাছে চারপাশের মহাকাশ কালো দেখায়।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলই আমাদের আকাশকে নীল দেখানোর প্রধান কারণ।
আকাশ কি সবসময় একই নীল থাকে?
না।
আকাশের রং আবহাওয়া, বাতাসের ধুলো, জলীয়বাষ্প এবং বায়ুমণ্ডলের অবস্থার ওপর কিছুটা নির্ভর করে।
পরিষ্কার দিনে আকাশ গভীর নীল দেখাতে পারে।
অন্যদিকে ধুলো বা দূষণ বেশি থাকলে আকাশ কিছুটা ফ্যাকাশে বা ধূসর দেখাতে পারে।
এমনকি পাহাড়ি এলাকায় পরিষ্কার বাতাসের কারণে আকাশ অনেক বেশি গাঢ় নীল মনে হতে পারে।
একটি সহজ উদাহরণ
একটি টর্চের আলো এবং ধোঁয়া দিয়ে আলোর বিচ্ছুরণ সহজে বোঝা যায়।
অন্ধকার ঘরে হালকা ধোঁয়া ছড়িয়ে টর্চের আলো ফেললে আলোর পথ কিছুটা দৃশ্যমান হয়।
কারণ ধোঁয়ার ক্ষুদ্র কণা আলোকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেয়।
বায়ুমণ্ডলেও অনেকটা একই ধরনের বিচ্ছুরণ ঘটে।
তবে আকাশের নীল রং তৈরির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে বায়ুর অণু।
