আমাদের শরীরের ভেতরে প্রতিনিয়ত রক্ত চলাচল করছে। আমরা হাঁটি, ঘুমাই বা কাজ করি। তবুও রক্তের এই যাত্রা কখনো থামে না।
কিন্তু রক্ত শরীরে কীভাবে ঘোরে? হৃদপিণ্ড কীভাবে রক্তকে সারা শরীরে পাঠায়? আবার সেই রক্ত কীভাবে ফিরে আসে?
এর পেছনে রয়েছে আমাদের শরীরের একটি অসাধারণ ব্যবস্থা। হৃদপিণ্ড, ধমনি, শিরা এবং সূক্ষ্ম কৈশিকনালি একসঙ্গে কাজ করে।
চলুন সহজভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি জেনে নেওয়া যাক।

হৃদপিণ্ড হলো রক্তের পাম্প
রক্ত সঞ্চালনের কেন্দ্র হলো হৃদপিণ্ড।
হৃদপিণ্ডকে শক্তিশালী পাম্পের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এটি নিয়মিত সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে রক্তকে বিভিন্ন দিকে পাঠায়।
হৃদপিণ্ডে চারটি প্রধান কক্ষ রয়েছে।
দুটি হলো অলিন্দ। অন্য দুটি হলো নিলয়।
এই কক্ষগুলো নির্দিষ্ট ক্রমে কাজ করে। ফলে রক্ত সঠিক পথে চলতে পারে।
শরীর থেকে রক্ত হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে
শরীরের কোষগুলো কাজ করার সময় রক্তের অক্সিজেন ব্যবহার করে।
ফলে অক্সিজেন কম থাকা রক্ত বিভিন্ন শিরার মাধ্যমে হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে।
প্রথমে এই রক্ত হৃদপিণ্ডের ডান অলিন্দে প্রবেশ করে।
এরপর রক্ত ডান নিলয়ে যায়।
ডান নিলয় সেই রক্তকে ফুসফুসের দিকে পাঠায়।
ফুসফুস রক্তে অক্সিজেন যোগ করে
ফুসফুসে পৌঁছানোর পর রক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।
রক্তে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড ফুসফুসের মাধ্যমে বের হয়ে যায়।
একই সময় আমরা শ্বাস নেওয়ার সময় বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করি।
এই অক্সিজেন ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ুথলি বা অ্যালভিওলাইয়ের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করে।
ফলে রক্ত আবার অক্সিজেনসমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
অক্সিজেনযুক্ত রক্ত আবার হৃদপিণ্ডে আসে
ফুসফুস থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে।
এবার রক্ত প্রবেশ করে বাম অলিন্দে।
তারপর এটি বাম নিলয়ে যায়।
বাম নিলয় শক্তভাবে সংকুচিত হয়ে রক্তকে প্রধান ধমনি বা অ্যাওর্টায় পাঠায়।
এরপর রক্ত বিভিন্ন ধমনির মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
ধমনি ও শিরার কাজ কী?
রক্ত চলাচলে ধমনি এবং শিরার ভূমিকা আলাদা।
ধমনি সাধারণত হৃদপিণ্ড থেকে রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে শিরা সাধারণত শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত হৃদপিণ্ডে ফিরিয়ে আনে।
তবে ফুসফুসের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু আলাদা হতে পারে।
ফুসফুসীয় ধমনি অক্সিজেন কম থাকা রক্ত হৃদপিণ্ড থেকে ফুসফুসে নিয়ে যায়।
আবার ফুসফুসীয় শিরা অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত ফুসফুস থেকে হৃদপিণ্ডে নিয়ে আসে।
কৈশিকনালি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ধমনি ও শিরার মাঝখানে রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম রক্তনালি।
এগুলোকে বলা হয় কৈশিকনালি বা ক্যাপিলারি।
এখানেই রক্ত ও শরীরের কোষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আদান-প্রদান ঘটে।
রক্ত থেকে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি কোষের কাছে পৌঁছে যায়।
অন্যদিকে কোষ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও বিভিন্ন বর্জ্য রক্তে চলে আসে।
এই কারণে কৈশিকনালি আমাদের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রক্ত কীভাবে আবার হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে?
কোষগুলোতে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার পর রক্ত ধীরে ধীরে শিরার দিকে যায়।
ছোট শিরাগুলো একত্রিত হয়ে বড় শিরা তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত বড় শিরার মাধ্যমে রক্ত হৃদপিণ্ডের ডান অলিন্দে ফিরে আসে।
এরপর আবার রক্ত ফুসফুসের দিকে যায়।
এই চক্র বারবার চলতে থাকে।
রক্ত কি শুধু অক্সিজেন বহন করে?
না।
রক্তের কাজ অনেক বেশি।
রক্ত শরীরে বহন করে—
- অক্সিজেন
- পুষ্টি
- হরমোন
- তাপ
- রোগ প্রতিরোধের বিভিন্ন উপাদান
আবার এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড ও বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ অপসারণেও সাহায্য করে।
তাই রক্তকে শরীরের পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়।
ব্যায়াম করলে রক্ত চলাচল বাড়ে কেন?
আপনি যখন দৌড়ান বা ব্যায়াম করেন, তখন পেশির বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়।
ফলে পেশির বেশি অক্সিজেন প্রয়োজন হয়।
এই চাহিদা পূরণ করতে হৃদপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হয়।
রক্ত চলাচলের গতিও বাড়ে।
ফলে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি দ্রুত পেশিতে পৌঁছে যায়।
ব্যায়াম শেষ হলে শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
রক্ত সঞ্চালন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আমাদের শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন ও পুষ্টি প্রয়োজন।
এই প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো কোষের কাছে পৌঁছে দেয় রক্ত।
আবার কোষের তৈরি বর্জ্যও রক্তের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তাই রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গেলে শরীরের অঙ্গগুলো দ্রুত সমস্যায় পড়তে শুরু করে।
পুরো প্রক্রিয়াটি এক নজরে
রক্ত সঞ্চালনের পুরো চক্রটি সহজভাবে মনে রাখা যায়—
শরীর → হৃদপিণ্ড → ফুসফুস → হৃদপিণ্ড → শরীর
অর্থাৎ হৃদপিণ্ড রক্তকে পাম্প করে। ফুসফুস রক্তে অক্সিজেন যোগ করে।
তারপর রক্ত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
আবার অক্সিজেন কম থাকা রক্ত হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে।
এভাবেই চক্রটি অবিরাম চলতে থাকে।
