রাতে আমরা বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করি। কিছুক্ষণ পর চারপাশের সবকিছু যেন ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যায়। আমরা ঘুমিয়ে পড়ি।
তখন মনে হয় শরীরও বুঝি পুরোপুরি বিশ্রামে চলে গেছে। আসলে বিষয়টি ঠিক তার উল্টো।
ঘুমের সময় শরীরের ভেতরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলতে থাকে। মস্তিষ্ক তথ্য গুছিয়ে নেয়। শরীরের কোষগুলো নিজেদের মেরামত করে। আবার হরমোন ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যায়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, ঘুমের সময় শরীর আসলে কী করে।
মস্তিষ্ক কি ঘুমের সময় বন্ধ থাকে?
একেবারেই নয়।
ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কাজের ধরন বদলে যায়। দিনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং তথ্য মস্তিষ্ক তখন গুছিয়ে নেয়।
বিশেষ করে দিনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য স্মৃতিতে সংরক্ষণে ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই পর্যাপ্ত ঘুম শেখা এবং স্মৃতিশক্তির জন্যও প্রয়োজনীয়।
শরীরের কোষ মেরামত হয়
দিনের ব্যস্ততায় আমাদের শরীরের কোষগুলো নানা ধরনের চাপের মধ্যে থাকে।
ঘুমের সময় শরীর মেরামতের কাজে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। বিশেষ করে গভীর ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন পুনর্গঠনমূলক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে।
পেশি ও অন্যান্য টিস্যুর পুনরুদ্ধারেও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শারীরিক পরিশ্রমের পর ভালো ঘুম শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সাহায্য করে।

শরীরে গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের কাজ চলে
ঘুমের সময় শরীরে বিভিন্ন হরমোনের নিঃসরণ ও নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন ঘটে।
এর মধ্যে গ্রোথ হরমোন উল্লেখযোগ্য। এটি শিশুদের বৃদ্ধি এবং বড়দের শরীরের টিস্যু মেরামতের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া ঘুম শরীরের ক্ষুধা, বিপাক এবং স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনগুলোর ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলে।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকে
আমাদের শরীর সবসময় জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত থাকে।
ঘুম এই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে সমর্থন করে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বলভাবে কাজ করতে পারে।
ফলে দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হৃদপিণ্ডও কিছুটা বিশ্রাম পায়
ঘুমের সময় সাধারণত হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ কমে আসে।
বিশেষ করে গভীর ঘুমের সময় শরীর তুলনামূলক শান্ত অবস্থায় থাকে।
এতে হৃদপিণ্ড এবং রক্তনালির ওপর দিনের তুলনায় চাপ কম থাকে।
তবে হৃদপিণ্ড কখনো পুরোপুরি থেমে যায় না। এটি ঘুমের মধ্যেও নিয়মিত রক্ত পাম্প করতে থাকে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের কী হয়?
ঘুমের সময় আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ও ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
গভীর ঘুমে শ্বাস সাধারণত ধীর এবং নিয়মিত হয়।
আবার REM ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা অনিয়মিত হতে পারে।
এই পর্যায়েই সাধারণত জীবন্ত ও বিস্তারিত স্বপ্ন বেশি দেখা যায়।
শরীরের তাপমাত্রা কমে
ঘুমের সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়।
শরীরের নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম এই পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাতে ঘুম আসার সময় শরীর ধীরে ধীরে বিশ্রামের উপযোগী অবস্থায় চলে যায়।
মস্তিষ্ক বর্জ্য পরিষ্কারে কাজ করে
ঘুমের সময় মস্তিষ্কের বর্জ্য অপসারণের প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের সময় মস্তিষ্কের গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ অপসারণে ভূমিকা রাখে।
এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক বলে মনে করা হয়।
স্বপ্ন কেন দেখি?
ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বপ্ন দেখা সম্ভব।
তবে REM পর্যায়ে স্বপ্ন সাধারণত বেশি জীবন্ত ও স্পষ্ট হয়।
এই সময়ে মস্তিষ্কের কিছু অংশ বেশ সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে শরীরের বড় পেশিগুলো সাময়িকভাবে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় থাকে।
ফলে আমরা স্বপ্নে দৌড়ালেও বাস্তবে বিছানা থেকে উঠে দৌড়াতে শুরু করি না।
ঘুমের সময় শরীর কি পুরোপুরি স্থির থাকে?
না।
ঘুমের মধ্যেও আমরা অবস্থান পরিবর্তন করি। কখনো পাশ ফিরি, হাত-পা নাড়ি বা শরীর সামান্য নড়াচড়া করি।
তবে গভীর ঘুমে এসব নড়াচড়া তুলনামূলক কম হতে পারে।
শরীর নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বারবার যায়।
পর্যাপ্ত ঘুম কেন দরকার?
ঘুমকে শুধু বিশ্রাম হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ভালো ঘুম মস্তিষ্ক, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাক এবং শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে মনোযোগ, স্মৃতি, মেজাজ এবং শারীরিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাই ব্যস্ততার কারণে ঘুমকে বাদ দেওয়া ভালো অভ্যাস নয়।
