লবণ পানিতে মিশে যায় কেন? সহজ বিজ্ঞান

এক গ্লাস পানিতে এক চামচ লবণ দিয়ে নেড়ে দেখুন। কিছুক্ষণ পর লবণ আর দেখা যাবে না। মনে হবে, লবণ যেন পানির মধ্যে হারিয়ে গেছে।

কিন্তু লবণ আসলে হারিয়ে যায় না। লবণ পানিতে মিশে যায় কেন, এর পেছনে রয়েছে অণু ও আয়নের চমৎকার বৈজ্ঞানিক আচরণ।

পানির অণু লবণের কণাগুলোকে আলাদা করে দেয়। এরপর সেই কণাগুলো পানির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আমরা লবণকে আর চোখে দেখতে পাই না।

চলুন বিষয়টি সহজভাবে বুঝে নেওয়া যাক।

লবণ পানিতে মিশে যায় কেন

লবণ আসলে কী?

আমাদের খাবার লবণের প্রধান উপাদান হলো সোডিয়াম ক্লোরাইড বা NaCl

লবণ দেখতে কঠিন এবং দানাদার হলেও এর ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র কণা থাকে।

সোডিয়াম ও ক্লোরাইড আয়ন একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে সাজানো থাকে।

লবণ পানিতে পড়লে পানির অণুগুলো এই আয়নগুলোর চারপাশে অবস্থান করতে শুরু করে।

পানির অণু কেন লবণকে আলাদা করে?

পানির অণুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

পানির অণুর এক পাশ সামান্য ধনাত্মক। অন্য পাশ সামান্য ঋণাত্মক।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণে পানি পোলার অণু হিসেবে পরিচিত।

লবণের সোডিয়াম আয়ন ধনাত্মক। অন্যদিকে ক্লোরাইড আয়ন ঋণাত্মক।

তাই পানির অণু সোডিয়াম ও ক্লোরাইড আয়নের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে।

এই আকর্ষণের কারণে লবণের স্ফটিক কাঠামো থেকে আয়নগুলো ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যায়।

লবণ পানিতে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে?

লবণ পানিতে পড়ার পর পানি লবণের দানার চারপাশে পৌঁছে যায়।

পানির অণুগুলো সোডিয়াম ও ক্লোরাইড আয়নকে আলাদা করে ঘিরে ফেলে।

এরপর এসব আয়ন পানির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

ফলে লবণের দানা ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত লবণের সব দ্রবণীয় অংশ পানির মধ্যে ছড়িয়ে যায়।

তখন আমরা বলি, লবণ পানিতে দ্রবীভূত হয়েছে।

লবণ কি সত্যিই অদৃশ্য হয়ে যায়?

না।

লবণ অদৃশ্য হয় না। বরং এটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়নে বিভক্ত হয়ে পানির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

তাই চোখে লবণ দেখা যায় না।

তবে পানির স্বাদ নিলে আমরা বুঝতে পারি, লবণ এখনও সেখানে রয়েছে।

পানিকে বাষ্পীভূত করলে আবার লবণের স্ফটিক পাওয়া যায়।

এটি প্রমাণ করে, লবণ পানির মধ্যে হারিয়ে যায়নি।

গরম পানিতে লবণ দ্রুত মেশে কেন?

একই পরিমাণ লবণ ঠান্ডা পানির তুলনায় গরম পানিতে অনেক সময় দ্রুত দ্রবীভূত হতে দেখা যায়।

এর কারণ হলো, গরম পানিতে পানির অণুগুলো তুলনামূলক দ্রুত চলাচল করে।

ফলে লবণের দানার সঙ্গে পানির অণুর মিথস্ক্রিয়া দ্রুত ঘটে।

তবে মনে রাখতে হবে, তাপমাত্রা বাড়লে সব পদার্থের দ্রাব্যতা একইভাবে বাড়ে না।

লবণের দ্রাব্যতা তাপমাত্রার সঙ্গে খুব বেশি পরিবর্তিত হয় না। মূল পার্থক্যটি অনেক সময় দেখা যায় দ্রবীভবনের গতিতে।

নেড়ে দিলে লবণ দ্রুত মিশে যায় কেন?

আপনি যদি পানিতে লবণ দিয়ে চামচ দিয়ে নাড়েন, লবণ দ্রুত মিশে যায়।

কারণ নাড়ার ফলে নতুন পানি বারবার লবণের দানার সংস্পর্শে আসে।

এতে লবণের আয়নগুলো দ্রুত পানির মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই নাড়লে লবণ দ্রবীভূত হওয়ার গতি বাড়ে।

বেশি লবণ দিলে কী হয়?

একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানিতে অসীম পরিমাণ লবণ দ্রবীভূত করা যায় না।

একসময় পানি আর অতিরিক্ত লবণকে দ্রবীভূত করতে পারে না।

তখন বাড়তি লবণ গ্লাসের নিচে জমে থাকে।

এই অবস্থাকে বলা হয় সম্পৃক্ত দ্রবণ

অর্থাৎ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পানির দ্রবীভূত করার একটি সীমা রয়েছে।

সমুদ্রের পানি নোনা কেন?

সমুদ্রের পানিতে বিভিন্ন ধরনের খনিজ লবণ দ্রবীভূত থাকে।

নদী ও বৃষ্টির পানি পাথর ও মাটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বিভিন্ন খনিজ সংগ্রহ করে।

এসব খনিজ শেষ পর্যন্ত নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে পৌঁছায়।

দীর্ঘ সময় ধরে এই লবণ ও খনিজ সমুদ্রে জমা হয়েছে।

তাই সমুদ্রের পানি নোনা।

লবণ ও চিনি কি একইভাবে পানিতে মেশে?

দুটিই পানিতে দ্রবীভূত হয়। তবে তাদের গঠন এক নয়।

লবণ পানিতে গিয়ে আয়নে বিভক্ত হয়।

অন্যদিকে চিনির অণুগুলো সাধারণত অক্ষত অবস্থায় পানির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

তবুও দুই ক্ষেত্রেই পানির অণু দ্রবীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একটি সহজ পরীক্ষা

বাড়িতে সহজেই বিষয়টি পরীক্ষা করা যায়।

দুটি গ্লাস নিন। একটিতে ঠান্ডা পানি এবং অন্যটিতে গরম পানি রাখুন।

দুই গ্লাসে সমপরিমাণ লবণ দিন।

তারপর দুটো গ্লাস একইভাবে নাড়ুন।

আপনি দেখতে পাবেন, গরম পানিতে লবণ দ্রুত মিশে যাচ্ছে।

এভাবে ছোট একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই দ্রবীভবনের বিষয়টি সহজে বোঝা যায়।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading