জোয়ার ভাটা কেন হয়? জানুন সহজ বিজ্ঞান
সমুদ্রের তীরে দাঁড়ালে একটি বিষয় সহজেই চোখে পড়ে। কখনো সমুদ্রের পানি তীরের দিকে অনেকটা এগিয়ে আসে। আবার কিছু সময় পর সেই পানি অনেক দূরে সরে যায়। এই নিয়মিত ওঠানামাকেই আমরা জোয়ার ভাটা বলি।
কিন্তু সমুদ্রের এত বিশাল পরিমাণ পানি কেন নিয়মিত ওঠানামা করে? এর পেছনে রয়েছে চাঁদ, সূর্য এবং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অসাধারণ প্রভাব।

জোয়ার কী?
যখন সমুদ্রের পানি স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় তীরের দিকে বেশি উঠে আসে, তখন তাকে জোয়ার বলা হয়।
জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। ফলে সৈকত বা নদীর মোহনায় পানি অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।
বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ারের প্রভাব খুব সহজে দেখা যায়।
ভাটা কী?
জোয়ারের বিপরীত অবস্থাকে বলা হয় ভাটা।
ভাটার সময় সমুদ্রের পানি তীর থেকে সরে যায়। ফলে সৈকতের অনেক অংশে বালু বা কাদা দেখা যায়।
কিছু উপকূলীয় এলাকায় জোয়ার ও ভাটার সময় পানির উচ্চতার পার্থক্য বেশ বড় হতে পারে।
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
জোয়ার-ভাটার প্রধান কারণ হলো চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি।
চাঁদ পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। একইভাবে পৃথিবীর সমুদ্রের পানিও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে কিছুটা আকৃষ্ট হয়।
পৃথিবীর যে পাশে চাঁদ থাকে, সেই পাশের সমুদ্রের পানি চাঁদের দিকে কিছুটা উঁচু হয়ে ওঠে। এর ফলে সেখানে জোয়ার তৈরি হয়।
তবে শুধু পৃথিবীর চাঁদমুখী পাশেই জোয়ার হয় না।
পৃথিবীর বিপরীত পাশেও জোয়ার হয় কেন?
এটি একটু আশ্চর্যের বিষয়।
পৃথিবীর চাঁদের বিপরীত পাশেও জোয়ার দেখা যায়। এর একটি কারণ হলো পৃথিবী ও চাঁদের যৌথ ঘূর্ণন এবং এর ফলে সৃষ্ট জড়তার প্রভাব।
সহজভাবে বললে, পৃথিবী ও চাঁদ একটি সাধারণ কেন্দ্রকে ঘিরে ঘোরে। এই গতির কারণে পৃথিবীর বিপরীত পাশের পানিতেও একটি জোয়ারের স্ফীতি তৈরি হয়।
ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সাধারণত দিনে প্রায় দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা দেখা যায়। তবে স্থানীয় ভূগোলের কারণে সময় ও উচ্চতার পার্থক্য হতে পারে।
সূর্যেরও প্রভাব আছে
চাঁদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সূর্যের মাধ্যাকর্ষণও জোয়ার-ভাটায় প্রভাব ফেলে।
সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক দূরে। তবে এর বিশাল ভরের কারণে এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী।
চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্যের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে জোয়ারের উচ্চতা পরিবর্তিত হতে পারে।
পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় জোয়ার বেশি হয় কেন?
পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করে।
তখন চাঁদ ও সূর্যের জোয়ার সৃষ্টিকারী প্রভাব একই দিকে কাজ করে। ফলে সাধারণ জোয়ারের তুলনায় বেশি উঁচু জোয়ার এবং বেশি নিচু ভাটা তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের জোয়ারকে বলা হয় spring tide বা তীব্র জোয়ার।
অন্যদিকে প্রথম ও শেষ চতুর্থাংশের চাঁদের সময় সূর্য ও চাঁদের প্রভাব একে অপরকে আংশিকভাবে প্রতিহত করে। তখন জোয়ারের উচ্চতা তুলনামূলক কম হয়।
এটিকে neap tide বলা হয়।
সব জায়গায় জোয়ারের উচ্চতা কি একই?
না, একেবারেই নয়।
সমুদ্রের তলদেশের আকৃতি, উপকূলের গঠন, পানির গভীরতা এবং স্থানীয় ভৌগোলিক অবস্থার কারণে বিভিন্ন জায়গায় জোয়ার-ভাটার উচ্চতা আলাদা হতে পারে।
কোথাও কয়েক মিটার পর্যন্ত পানির উচ্চতার পরিবর্তন দেখা যায়। আবার কোনো জায়গায় পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে কম।
তাই জোয়ার-ভাটার সময়সূচিও একেক উপকূলে একেক রকম হয়।
জোয়ার-ভাটার গুরুত্ব
জোয়ার-ভাটা শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। উপকূলীয় মানুষের জীবনেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
মৎস্যজীবীরা জোয়ার-ভাটার সময় বুঝে মাছ ধরার পরিকল্পনা করেন। নৌযান চলাচল এবং নদীর মোহনায় পণ্য পরিবহনেও এর প্রভাব রয়েছে।
এছাড়া উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রেও জোয়ার-ভাটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন এই নিয়মিত পানির ওঠানামার সঙ্গে যুক্ত।
শেষ কথা
তাহলে জোয়ার ভাটা কেন হয়? এর প্রধান কারণ হলো চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। সূর্যের মাধ্যাকর্ষণও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পৃথিবীর ঘূর্ণন, চাঁদ ও সূর্যের অবস্থান এবং স্থানীয় ভূগোলের কারণে জোয়ার-ভাটার সময় ও উচ্চতা পরিবর্তিত হয়।
সমুদ্রের পানির এই নিয়মিত ওঠানামা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর প্রকৃতি কত সুন্দরভাবে মহাকাশের অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
চাঁদ আকাশে নীরবে ঘুরছে, পৃথিবীও নিজের কক্ষপথে চলছে। আর তাদের পারস্পরিক আকর্ষণের প্রভাবেই সমুদ্রের বিশাল জলরাশি প্রতিদিন ছন্দের মতো ওঠানামা করছে।
