হৃদপিণ্ড কীভাবে কাজ করে? সহজ ভাষায় জানুন

আমাদের বুকের ভেতরে সারাক্ষণ একটি অঙ্গ কাজ করে চলেছে। আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও তার কাজ থামে না।

এই অঙ্গটির নাম হৃদপিণ্ড বা হার্ট

একজন মানুষ দিনে হাজার হাজার বার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন অনুভব করতে পারেন। তবে হৃদপিণ্ড শুধু স্পন্দিত হয় না। এটি পুরো শরীরে রক্ত সঞ্চালন করে।

রক্তের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ সরিয়ে নেওয়া হয়।

তাহলে প্রশ্ন হলো, হৃদপিণ্ড কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে?

চলুন খুব সহজভাবে বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক।

হৃদপিণ্ড কীভাবে কাজ করে

হৃদপিণ্ড কোথায় থাকে?

হৃদপিণ্ড আমাদের বুকের মাঝামাঝি অংশে থাকে। এটি বুকের হাড়ের পেছনে অবস্থান করে।

হৃদপিণ্ডের বেশিরভাগ অংশ সামান্য বাম দিকে থাকে। তাই অনেকেই মনে করেন, হার্ট পুরোপুরি বাম পাশে থাকে।

আসলে এটি বুকের মাঝামাঝি অবস্থান করে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃদপিণ্ড সাধারণত নিজের মুঠোর কাছাকাছি আকারের হয়।

হৃদপিণ্ডের প্রধান কাজ কী?

হৃদপিণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রক্ত পাম্প করা

এই রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেয়—

  • অক্সিজেন
  • পুষ্টি
  • হরমোন
  • বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পদার্থ

আবার রক্ত শরীরের কোষ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ করে।

তাই হৃদপিণ্ডকে শরীরের একটি শক্তিশালী পাম্পের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

হৃদপিণ্ডের ভেতরে কয়টি কক্ষ থাকে?

মানুষের হৃদপিণ্ডে চারটি প্রধান কক্ষ রয়েছে।

দুটি ওপরের কক্ষকে বলা হয় অলিন্দ বা অ্যাট্রিয়াম

আর দুটি নিচের কক্ষকে বলা হয় নিলয় বা ভেন্ট্রিকল

চারটি কক্ষ হলো—

কক্ষপ্রধান কাজ
ডান অলিন্দশরীর থেকে আসা রক্ত গ্রহণ করে
ডান নিলয়ফুসফুসে রক্ত পাঠায়
বাম অলিন্দফুসফুস থেকে আসা রক্ত গ্রহণ করে
বাম নিলয়পুরো শরীরে রক্ত পাঠায়

এই চারটি কক্ষ একসঙ্গে কাজ করেই রক্ত চলাচল বজায় রাখে।

রক্ত হৃদপিণ্ডে কীভাবে আসে?

শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন ব্যবহারের পর রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়।

এই রক্ত শিরার মাধ্যমে হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে।

প্রথমে এটি ডান অলিন্দে প্রবেশ করে।

এরপর রক্ত ডান নিলয়ে যায়।

ডান নিলয় সেই রক্তকে ফুসফুসের দিকে পাঠায়।

ফুসফুসের সঙ্গে হৃদপিণ্ডের সম্পর্ক কী?

ফুসফুস আমাদের রক্তে অক্সিজেন যোগ করে।

ডান নিলয় থেকে রক্ত ফুসফুসে পৌঁছালে সেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়ে যায়।

একই সঙ্গে রক্ত অক্সিজেন গ্রহণ করে।

এরপর অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত আবার হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে।

এবার রক্ত প্রবেশ করে বাম অলিন্দে

তারপর রক্ত বাম নিলয়ে যায়।

বাম নিলয় এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

বাম নিলয় হৃদপিণ্ডের একটি শক্তিশালী কক্ষ।

এটি অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তকে সারা শরীরে পাঠায়।

বাম নিলয় সংকুচিত হলে রক্ত প্রধান ধমনি বা অ্যাওর্টা দিয়ে বেরিয়ে যায়।

এরপর বিভিন্ন ধমনির মাধ্যমে রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে যায়।

এভাবেই আমাদের মস্তিষ্ক, পেশি, ত্বক এবং অন্যান্য অঙ্গ অক্সিজেন পায়।

হার্টবিট কীভাবে হয়?

হৃদপিণ্ডের পেশি নির্দিষ্ট ছন্দে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়।

হৃদপিণ্ড সংকুচিত হলে রক্ত বাইরে পাম্প হয়।

আবার হৃদপিণ্ড শিথিল হলে রক্ত তার কক্ষে প্রবেশ করে।

এই নিয়মিত সংকোচন ও প্রসারণই আমরা হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন হিসেবে অনুভব করি।

হৃদপিণ্ডের এই ছন্দ নিয়ন্ত্রণে বৈদ্যুতিক সংকেত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?

হৃদপিণ্ডের ভেতরে একটি বিশেষ অংশ রয়েছে। এর নাম সাইনোঅ্যাট্রিয়াল নোড বা SA node

এটিকে হৃদপিণ্ডের প্রাকৃতিক পেসমেকার বলা হয়।

এখান থেকে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়।

সংকেতটি হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নির্দিষ্ট ক্রমে হৃদপেশি সংকুচিত হয়।

এর ফলেই হৃদপিণ্ড নিয়মিতভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে।

হার্টের ভালভ কী কাজ করে?

হৃদপিণ্ডে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভালভ রয়েছে।

এগুলো রক্তকে সঠিক দিকে চলতে সাহায্য করে।

সহজভাবে বললে, ভালভ অনেকটা দরজার মতো কাজ করে।

রক্ত সামনে যাওয়ার সময় দরজা খুলে যায়। আবার রক্ত পেছনে ফিরে যেতে চাইলে দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

ফলে রক্তের প্রবাহ সঠিক পথে থাকে।

পুরো রক্ত সঞ্চালনের প্রক্রিয়া

হৃদপিণ্ডের কাজটি একটি সহজ চক্র হিসেবে মনে রাখা যায়।

শরীর → ডান অলিন্দ → ডান নিলয় → ফুসফুস → বাম অলিন্দ → বাম নিলয় → শরীর

এই চক্রটি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চলতে থাকে।

আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও হৃদপিণ্ড এই কাজ চালিয়ে যায়।

ব্যায়াম করলে হৃদস্পন্দন কেন বাড়ে?

আপনি যখন হাঁটেন, দৌড়ান বা ব্যায়াম করেন, তখন শরীরের কোষগুলোর বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়।

ফলে তাদের বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়।

এই চাহিদা পূরণ করতে হৃদপিণ্ড দ্রুত রক্ত পাম্প করে।

তাই ব্যায়ামের সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।

ব্যায়াম শেষ করার পর শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখা কেন জরুরি?

হৃদপিণ্ড ঠিকভাবে কাজ না করলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও সমস্যায় পড়তে পারে।

তাই হৃদপিণ্ডের যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু সাধারণ অভ্যাস হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

যেমন—

  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা
  • সুষম খাবার খাওয়া
  • অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো
  • পর্যাপ্ত ঘুমানো
  • ধূমপান এড়িয়ে চলা
  • ওজন স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রাখা
  • দীর্ঘ সময় বসে না থাকা

তবে কোনো হৃদরোগের লক্ষণ থাকলে শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading