বৃষ্টির দিনে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ও স্কুল জীবনের স্মৃতি

বৃষ্টির দিনে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ও স্কুল জীবনের স্মৃতি

  গ্রামের বর্ষাকাল মানেই ছিল অন্যরকম এক আনন্দ। আকাশজুড়ে তখন জমতো কালো মেঘ। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করতো।

আজ শহরের ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। আসলে, শৈশবের সেই স্মৃতিগুলো বুকের ভেতর এখনো জীবন্ত হয়ে আছে।

দীর্ঘ পথের সেই স্কুল যাত্রা
আমাদের গ্রামের স্কুলটা ছিল অনেক দূরে। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হতো। তখন কোনো সাইকেল বা রিকশা ছিল না। তাই, ছোট্ট বয়সেই কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ভোরে বের হতাম।

বিশেষ করে, বর্ষার দিনে সেই পথ আরও কঠিন হয়ে উঠত। গ্রামের কাঁচা রাস্তা তখন পুরোপুরি কাদায় ভরে যেত।

কোথাও হাঁটুসমান কাদা থাকতো। আবার কোথাও বৃষ্টির পানিতে ছোট ছোট খাল তৈরি হতো। তবুও, আমরা কয়েকজন বন্ধু একসাথে হাসিমুখে রওনা দিতাম।

কাদা মাটি আর বন্ধুদের আড্ডা
হাঁটার সময় কারো পা পিছলে পড়ে যাওয়া ছিল সাধারণ ঘটনা। তখন আমরা সবাই মিলে একসাথে হেসে উঠতাম। সেই হাসিতে কোনো রাগ বা লজ্জা ছিল না।

অনেক সময় আমরা জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটতাম। কারণ, কাদায় জুতা আটকে গিয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। তবে, ভেজা মাটির সেই ঠান্ডা অনুভূতি আজও পায়ের নিচে টের পাই।

রাস্তার পাশের ধানক্ষেত আর পুকুরের ব্যাঙের ডাক আমাদের আনন্দ দিত। তাছাড়া, দূরের গরুর ঘণ্টার শব্দ পথচলাকে কখনো একঘেয়ে হতে দিত না।

ছাতার নিচে যুদ্ধ ও ক্লাসরুমের গল্প
স্কুলে পৌঁছানোর আগেই আমাদের জামা পুরোপুরি ভিজে যেত। কখনো ছাতা থাকত, আবার কখনো থাকত না। তাই, এক ছাতার নিচে তিনজন গাদাগাদি করে হাঁটতাম।

স্কুলে গিয়ে বেঞ্চে বসলে শিক্ষক আমাদের কাদা মাখা পা দেখতেন। এজন্য তিনি মাঝে মাঝে বকা দিতেন। কিন্তু, সেই বকুনির মধ্যেও এক ধরনের স্নেহ লুকিয়ে ছিল।

ফেরার পথের আসল আনন্দ
বৃষ্টির দিনে স্কুল ছুটি হলে আনন্দটা আরও বেড়ে যেত। যেমন, ফেরার পথে আমরা ইচ্ছে করেই পানিভর্তি গর্তে লাফ দিতাম।

কেউ কাগজের নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসিয়ে দিত। আবার কেউ ড্রেনের পাশে ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করত। আসলে, সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ছিল আমাদের সত্যিকারের সুখ।

প্রযুক্তির যুগে হারিয়ে যাওয়া শৈশব
তখন জীবন খুব সহজ ছিল। ফলে, সামান্য জিনিসেই আমরা আনন্দ খুঁজে পেতাম।

এখনকার শিশুদের হাতে মোবাইল এবং ভিডিও গেম আছে। কিন্তু, আমাদের ছিল উন্মুক্ত মাঠ, বৃষ্টি আর কাদামাটি। হয়তো সেই কারণেই আমাদের শৈশবটা এত রঙিন ছিল।

শেষ কথা
বর্তমানে গ্রামের সেই কাঁচা রাস্তা পাকা হয়ে গেছে। এখন স্কুলে যাওয়ার জন্য ভ্যান আর মোটরসাইকেল চলে। তবুও, সেই কাদামাখা পথের আনন্দ আর কোথাও খুঁজে পাই না।

সময় এবং মানুষ দুটোই বদলে গেছে। কিন্তু, বৃষ্টির দিনে গ্রামের রাস্তার স্মৃতিগুলো হৃদয়ে চিরকাল অমলিন থাকবে।

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading