প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠে এবং পৃথিবীকে আলো ও তাপ দেয়। তার আলো ছাড়া পৃথিবীর জীবন কল্পনা করা কঠিন। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, সূর্য একদিন নিভে যাবে কি?
সংক্ষেপে বললে, হ্যাঁ, একদিন সূর্যের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। তবে সেই সময় আসতে এখনও প্রায় ৫০০ কোটি বছর বাকি।
অর্থাৎ আমাদের বর্তমান সভ্যতার জন্য সূর্য হঠাৎ নিভে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। সূর্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের জীবনচক্রের মাধ্যমে অনেক কিছু জানতে পেরেছেন।

সূর্য কীভাবে আলো তৈরি করে?
সূর্য একটি বিশাল নক্ষত্র। এর কেন্দ্রে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা এবং প্রচণ্ড চাপ রয়েছে।
সেখানে হাইড্রোজেন পরমাণু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে নিউক্লিয়ার ফিউশন বলা হয়।
এই ফিউশন প্রক্রিয়ার সময় বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। সেই শক্তিই আলো এবং তাপ হিসেবে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।
পৃথিবীতে পৌঁছানো সূর্যের শক্তিই আমাদের আবহাওয়া ও জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূর্যের জ্বালানি কি শেষ হয়ে যাবে?
হ্যাঁ, সূর্যের কেন্দ্রে থাকা হাইড্রোজেন চিরকাল থাকবে না। ধীরে ধীরে সেই জ্বালানি কমতে থাকবে।
সূর্য বর্তমানে তার জীবনের মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, সূর্যের বয়স প্রায় ৪৬০ কোটি বছর।
আরও প্রায় ৫০০ কোটি বছর ধরে এটি বর্তমান ধরনের নক্ষত্র হিসেবে থাকতে পারে।
এরপর সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের পরিমাণ অনেক কমে যাবে। তখন সূর্যের জীবনে বড় পরিবর্তন শুরু হবে।
সূর্য কি হঠাৎ নিভে যাবে?
না, সূর্য হঠাৎ একটি বাতির মতো নিভে যাবে না। এর পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটবে।
হাইড্রোজেন জ্বালানি কমে গেলে সূর্যের কেন্দ্র সংকুচিত হবে। একই সময়ে সূর্যের বাইরের অংশ ব্যাপকভাবে প্রসারিত হতে শুরু করবে।
তখন সূর্য একটি লাল দানব নক্ষত্রে পরিণত হবে।
এই পর্যায়ে সূর্যের আকার বর্তমানের তুলনায় বহু গুণ বড় হয়ে যাবে।
পৃথিবীর কী হবে?
সূর্য যখন লাল দানবে পরিণত হবে, তখন পৃথিবীর পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যাবে।
সূর্যের তাপ অনেক বেড়ে যাবে। ফলে পৃথিবীর সমুদ্র শুকিয়ে যেতে পারে এবং বর্তমান জীবনের অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে পড়বে।
পৃথিবী সূর্যের বাইরের প্রসারিত স্তরের মধ্যে পড়বে কি না, সেটি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও চলছে।
তবে পৃথিবী মানুষের বসবাসের উপযোগী থাকবে না, এটি প্রায় নিশ্চিত।
সূর্যের শেষ পরিণতি কী?
লাল দানব পর্যায়ের পর সূর্য ধীরে ধীরে তার বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে দেবে।
এর কেন্দ্রে একটি অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত অবশিষ্ট অংশ থাকবে। এটিকে শ্বেত বামন বলা হয়।
শ্বেত বামন নিজে নতুন করে নিউক্লিয়ার ফিউশন চালিয়ে সূর্যের মতো শক্তি উৎপন্ন করবে না।
তবে এটি শুরুতে অত্যন্ত উত্তপ্ত থাকবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাবে।
সূর্য পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাবে?
অত্যন্ত দীর্ঘ সময় পরে সূর্যের অবশিষ্ট অংশ আরও ঠান্ডা হয়ে যাবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে বিপুল পরিমাণ।
তাত্ত্বিকভাবে ভবিষ্যতে শ্বেত বামন আরও ঠান্ডা হয়ে একটি কালো বামনে পরিণত হতে পারে।
তবে মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই এখন পর্যন্ত কোনো কালো বামন দেখা যায়নি।
সূর্য না থাকলে পৃথিবীর কী হবে?
যদি সূর্য হঠাৎ আলো দেওয়া বন্ধ করে দিত, পৃথিবীর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেত।
সূর্যের আলো না থাকলে পৃথিবীর পৃষ্ঠ দ্রুত ঠান্ডা হতে শুরু করত। উদ্ভিদও সালোকসংশ্লেষণ করতে পারত না।
তবে বাস্তবে সূর্য এভাবে হঠাৎ নিভে যাবে না। এর পরিবর্তন হবে অত্যন্ত ধীর গতিতে।
মানবসভ্যতা যদি তখনও টিকে থাকে, তাহলে পৃথিবীর বাইরে বসবাসের প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
সূর্য একদিন নিভে যাবে কি? বর্তমান অবস্থায় সূর্য চিরকাল থাকবে না। তবে তার পরিবর্তন শুরু হতে এখনও প্রায় ৫০০ কোটি বছর সময় আছে।
প্রথমে সূর্য লাল দানবে পরিণত হবে। এরপর এর বাইরের স্তরগুলো ছড়িয়ে পড়বে এবং কেন্দ্রে শ্বেত বামন অবশিষ্ট থাকবে।
তাই সূর্যের মৃত্যু নিয়ে এখন আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং এই বিশাল সময় আমাদের মহাবিশ্বের দীর্ঘ ইতিহাস বোঝার সুযোগ দেয়।
সূর্যের জীবনচক্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্বে কোনো নক্ষত্রই চিরস্থায়ী নয়। তবে মানুষের বর্তমান জীবনের সময়ের তুলনায় সূর্যের ভবিষ্যৎ এখনও অবিশ্বাস্যভাবে দীর্ঘ।
