মানুষের রক্ত লাল কেন?
মানুষের শরীরে সব সময় রক্ত চলাচল করছে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, রক্ত লাল কেন?
এর প্রধান কারণ হলো রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিন এমন একটি প্রোটিন, যার মধ্যে লোহা থাকে।
এই হিমোগ্লোবিনই ফুসফুস থেকে অক্সিজেন শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে এটি রক্তকে লাল রংও দেয়।

হিমোগ্লোবিন কী?
হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন। এটি মূলত অক্সিজেন পরিবহনের কাজ করে।
আমরা যখন শ্বাস নিই, তখন ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবেশ করে। এরপর অক্সিজেন হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
রক্ত তখন সেই অক্সিজেন শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেয়।
অন্যদিকে, কোষে তৈরি কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি অংশ রক্তের মাধ্যমে আবার ফুসফুসে ফিরে আসে। এরপর আমরা শ্বাস ছাড়ার সময় সেটি শরীর থেকে বের করে দিই।
হিমোগ্লোবিনের জন্য রক্ত লাল হয় কীভাবে?
হিমোগ্লোবিনের গঠনে হিম নামের একটি অংশ থাকে। এর কেন্দ্রে লোহার একটি পরমাণু রয়েছে।
এই হিম অংশ আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। আবার কিছু আলো প্রতিফলিত করে।
ফলে আমাদের চোখে হিমোগ্লোবিনযুক্ত রক্ত লাল দেখায়।
অক্সিজেনের পরিমাণের ওপর রক্তের লালের মাত্রাতেও কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।
অক্সিজেনযুক্ত রক্ত উজ্জ্বল লাল কেন?
ফুসফুস থেকে বের হওয়ার পর রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি থাকে। এই অক্সিজেন হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
তখন রক্ত সাধারণত উজ্জ্বল লাল দেখায়।
এই রক্ত ধমনীর মাধ্যমে হৃদয় থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে যায়।
অক্সিজেন কম থাকা রক্ত গাঢ় লাল কেন?
শরীরের কোষগুলো রক্ত থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে ফিরে আসা রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে।
তখন রক্ত সাধারণত গাঢ় লাল দেখায়।
তবে এটি নীল হয়ে যায় না।
শিরার রক্ত নীল দেখায় কেন?
অনেক সময় হাতের শিরা নীল বা সবুজাভ দেখায়। তাই অনেকে মনে করেন, শিরার রক্ত বুঝি নীল।
আসলে মানুষের রক্ত নীল নয়। শিরার ভেতরের রক্তও লাল।
ত্বক এবং আলো কীভাবে শোষিত ও প্রতিফলিত হয়, তার কারণে শিরাগুলো বাইরে থেকে নীল বা সবুজাভ দেখা যেতে পারে।
তাই হাতের ওপর নীল শিরা দেখা গেলেও তার ভেতরের রক্ত নীল নয়।
রক্তে লোহা না থাকলে কী হতো?
হিমোগ্লোবিনের জন্য লোহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত লোহা না থাকলে শরীর পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে সমস্যায় পড়তে পারে।
এর ফলে রক্তের অক্সিজেন বহন করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
তাই খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত লোহা পাওয়া শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
লোহা পাওয়া যায় এমন খাবারের মধ্যে রয়েছে—
- মাছ ও মাংস
- ডিম
- ডাল
- পালং শাকসহ কিছু শাকসবজি
- বাদাম ও বীজ
- লোহা সমৃদ্ধ কিছু খাদ্য
তবে শুধু রক্তের রং দেখে শরীরে লোহার ঘাটতি আছে কি না বোঝা যায় না।
সব প্রাণীর রক্ত কি লাল?
না। সব প্রাণীর রক্ত লাল নয়।
রক্তের রং মূলত কোন ধরনের অক্সিজেন-বহনকারী প্রোটিন রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করতে পারে।
যেমন, মানুষের রক্তে হিমোগ্লোবিন রয়েছে। তাই মানুষের রক্ত লাল।
আবার কিছু প্রাণীর শরীরে ভিন্ন ধরনের অক্সিজেন-বহনকারী প্রোটিন থাকে। ফলে তাদের শরীরের তরলের রং ভিন্ন হতে পারে।
রক্তের লাল রং কি শুধু অক্সিজেনের কারণে?
শুধু অক্সিজেন নয়। রক্তের লাল রঙের মূল কারণ হলো হিমোগ্লোবিন।
অক্সিজেনের সঙ্গে হিমোগ্লোবিনের যুক্ত হওয়ার কারণে রক্তের লালের উজ্জ্বলতায় পরিবর্তন আসে।
তাই অক্সিজেনযুক্ত এবং অক্সিজেন কম থাকা রক্তের রং কিছুটা আলাদা দেখায়।
সহজভাবে পুরো বিষয়টি
বিষয়টি সহজভাবে এমনভাবে ভাবতে পারেন।
ফুসফুস হলো শরীরের অক্সিজেন সংগ্রহের জায়গা। রক্ত সেই অক্সিজেন বহন করে শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেয়।
এই কাজের প্রধান বাহক হলো হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের মধ্যে থাকা হিম ও লোহা রক্তকে লাল রং দেয়।
অর্থাৎ, মানুষের রক্ত লাল হওয়ার প্রধান কারণ হলো লোহিত রক্তকণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিন।
শেষ কথা
মানুষের রক্ত লাল হওয়া আসলে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এর পেছনে রয়েছে হিমোগ্লোবিনের বিশেষ গঠন।
হিমোগ্লোবিন শুধু রক্তকে লাল করে না। এটি শরীরের কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজও করে।
তাই রক্তের লাল রং শুধু একটি বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য নয়। এর সঙ্গে আমাদের শরীরের শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শক্তি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
