বর্ষাকাল এলেই মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। তখন অনেকেই ভাবেন, মশা কাদের বেশি কামড়ায়? একই ঘরে থেকেও কেন একজনকে বেশি কামড়ায়? আবার অন্যজনকে তুলনামূলকভাবে কম কামড়ায়। এর পেছনে মানুষের শরীরের কিছু স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য কাজ করে।
মশা মানুষকে খুঁজে পেতে শরীরের গন্ধ, নিঃশ্বাস এবং তাপমাত্রা ব্যবহার করে। এছাড়া ঘাম ও ত্বকের রাসায়নিক উপাদানও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কিছু মানুষ মশার কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারেন।

মশা কীভাবে মানুষকে খুঁজে পায়?
মশা শুধু চোখের সাহায্যে মানুষ খুঁজে পায় না। তারা বিভিন্ন ধরনের সংকেত ব্যবহার করে। মানুষের নিঃশ্বাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়।
মশা এই গ্যাস শনাক্ত করতে পারে। এরপর তারা শরীরের গন্ধ ও উষ্ণতার দিকে এগিয়ে আসে। ফলে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য মশার আকর্ষণে ভূমিকা রাখে।
যাদের শরীরের গন্ধ মশাকে আকৃষ্ট করে
প্রত্যেক মানুষের শরীরের প্রাকৃতিক গন্ধ আলাদা। ত্বক, ঘাম এবং ত্বকের জীবাণুর কারণে এই গন্ধ তৈরি হয়।
কিছু মানুষের ত্বকে নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদান বেশি থাকতে পারে। এসব উপাদানের গন্ধ কিছু মশাকে বেশি আকৃষ্ট করতে পারে।
তাই একই পরিবেশে থেকেও একজন মানুষ বেশি কামড় খেতে পারেন। অন্যদিকে তার পাশে থাকা ব্যক্তি তুলনামূলকভাবে কম কামড় খেতে পারেন।
বেশি ঘামলে কি মশা বেশি কামড়ায়?
গরমে বা ব্যায়ামের পর শরীরে ঘাম বেশি হয়। ঘামের সঙ্গে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ত্বকের ওপর জমে থাকে।
এসব পদার্থের গন্ধ মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে। তাই বেশি ঘামার সময় মশার কামড়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
তবে শুধু ঘামই এর একমাত্র কারণ নয়। শরীরের সামগ্রিক গন্ধ এবং পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভবতী নারীদের কি বেশি কামড়ায়?
গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে বিভিন্ন স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। এ সময় নিঃশ্বাস এবং শরীরের তাপমাত্রায় কিছু পরিবর্তন হতে পারে।
কিছু গবেষণায় গর্ভবতী নারীদের প্রতি মশার আকর্ষণ বেশি দেখা গেছে। তবে সব মশার প্রজাতির ক্ষেত্রে একই বিষয় প্রযোজ্য নয়।
রক্তের গ্রুপ কি মশার কামড়ে প্রভাব ফেলে?
রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মশার আকর্ষণের সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপের প্রতি মশার আকর্ষণে পার্থক্য দেখা গেছে।
তবে শুধু রক্তের গ্রুপ দিয়ে মশার কামড়ের মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। শরীরের গন্ধ, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
গাঢ় পোশাকে কি মশা বেশি আসে?
মশা মানুষের উপস্থিতি শনাক্ত করতে দৃষ্টিগত সংকেতও ব্যবহার করে। কাছাকাছি অবস্থায় গাঢ় রঙের পোশাক কিছু পরিস্থিতিতে বেশি দৃশ্যমান হতে পারে।
তাই মশার উপদ্রব বেশি থাকলে হালকা রঙের পোশাক পরা ভালো। পাশাপাশি হাত-পা ঢেকে রাখলে কামড়ের ঝুঁকি কমানো যায়।
কার্বন ডাই-অক্সাইড কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মানুষ নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে। মশা এই গ্যাসের প্রতি খুব সংবেদনশীল।
তাই মানুষের নিঃশ্বাস মশাকে সম্ভাব্য খাবারের উৎসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। শারীরিক কার্যকলাপের সময় নিঃশ্বাসের পরিমাণ বাড়তে পারে।
ফলে ব্যায়াম বা পরিশ্রমের পর মশার আকর্ষণ কিছু ক্ষেত্রে বেড়ে যেতে পারে।
মশার কামড় থেকে বাঁচার সহজ উপায়
মশার কামড় এড়াতে রাতে মশারি ব্যবহার করুন। বাইরে গেলে ফুলহাতা জামা এবং লম্বা পোশাক পরুন।
জানালা ও দরজায় মশার জাল ব্যবহার করাও উপকারী। প্রয়োজনে অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা। টব, বালতি, ড্রাম বা অন্য কোনো পাত্রে পানি জমতে দেবেন না।
কারণ জমে থাকা পানি মশার প্রজননের উপযুক্ত স্থান হতে পারে। তাই নিয়মিত জমে থাকা পানি ফেলে দিন।
মশার কামড় কেন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত?
মশা শুধু বিরক্তির কারণ নয়। কিছু মশা বিভিন্ন রোগের জীবাণু মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে।
ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি রয়েছে। তাই মশার কামড় কমানো শুধু আরামের বিষয় নয়।
বরং এটি পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শেষ কথা
মশা কাদের বেশি কামড়ায়, তার নির্দিষ্ট একটি উত্তর নেই। মানুষের শরীরের গন্ধ, ঘাম এবং নিঃশ্বাস এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া শরীরের তাপমাত্রা, পোশাক এবং আশপাশের পরিবেশও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কাউকে বেশি কামড়ালেই তার কোনো বিশেষ সমস্যা আছে, এমন নয়।
মশার কামড় থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখা জরুরি। নিয়মিত জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলুন।
পাশাপাশি মশারি ব্যবহার করুন এবং প্রয়োজনে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন। সচেতন থাকলেই মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
