রাতের আকাশের দিকে তাকালে মহাকাশকে রহস্যময় মনে হয়। তবে মহাকাশ নিয়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই মনে আসে। মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না কেন? পৃথিবীতে আমরা প্রতিদিন নানা ধরনের শব্দ শুনি। কিন্তু মহাকাশে গেলে সেই পরিচিত শব্দের জগৎ যেন হঠাৎ থেমে যায়।

শব্দ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে?
শব্দ আসলে এক ধরনের কম্পন। কোনো বস্তু কম্পিত হলে তার আশপাশের কণাগুলোও কম্পিত হয়। এরপর সেই কম্পন এক কণা থেকে অন্য কণায় ছড়িয়ে পড়ে।
বাতাসের কণাগুলো শব্দের কম্পন আমাদের কানে পৌঁছে দেয়। তাই আমরা মানুষের কথা, পাখির ডাক কিংবা গাড়ির শব্দ শুনতে পারি। তবে শব্দ চলাচলের জন্য অবশ্যই কোনো মাধ্যম প্রয়োজন।
মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না কেন?
মহাকাশের বেশিরভাগ অংশ প্রায় সম্পূর্ণ শূন্যস্থান। সেখানে পৃথিবীর মতো ঘন বাতাস নেই। ফলে শব্দের কম্পন বহন করার মতো পর্যাপ্ত কণা পাওয়া যায় না।
এই কারণেই মহাকাশে সাধারণ শব্দ ছড়িয়ে পড়তে পারে না। অর্থাৎ একটি মহাকাশযানের বাইরে বিস্ফোরণ ঘটলেও কাছের নভোচারী সরাসরি সেই শব্দ শুনতে পারবেন না।
সিনেমায় মহাকাশের বিস্ফোরণের সময় আমরা প্রচণ্ড শব্দ শুনি। বাস্তবে এমন শব্দ শোনা সম্ভব নয়। সিনেমার দৃশ্যকে আকর্ষণীয় করতে নির্মাতারা এসব শব্দ যুক্ত করেন।
তাহলে নভোচারীরা কীভাবে কথা বলেন?
মহাকাশে শব্দ চলতে না পারলেও নভোচারীরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এজন্য তারা বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করেন।
নভোচারীদের হেলমেটে মাইক্রোফোন এবং স্পিকার থাকে। মাইক্রোফোন কণ্ঠের শব্দকে বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিবর্তন করে।
এরপর সেই সংকেত রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে অন্য নভোচারীর কাছে পৌঁছে যায়। রেডিও তরঙ্গ চলার জন্য বাতাসের প্রয়োজন হয় না।
অন্য নভোচারীর যন্ত্র সেই সংকেত গ্রহণ করে। এরপর স্পিকার সংকেতকে আবার শব্দে রূপান্তর করে। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের কথা শুনতে পারেন।
মহাকাশযানের ভেতরে শব্দ শোনা যায়?
হ্যাঁ, মহাকাশযানের ভেতরে শব্দ শোনা যায়। কারণ সেখানে নভোচারীদের জন্য বাতাসের ব্যবস্থা থাকে।
মহাকাশযানের ভেতরের বাতাস শব্দের কম্পন বহন করে। তাই নভোচারীরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
এছাড়া বিভিন্ন যন্ত্রপাতির শব্দও সেখানে শোনা যায়। ফ্যান, পাম্প এবং অন্যান্য যন্ত্র মহাকাশযানের ভেতরে শব্দ তৈরি করে।
মহাকাশ কি পুরোপুরি নীরব?
সাধারণ শব্দের ক্ষেত্রে মহাকাশ অনেকটাই নীরব। তবে এর অর্থ মহাকাশে কোনো তরঙ্গ চলাচল করে না, এমন নয়।
আলো এবং রেডিও তরঙ্গ মহাকাশের শূন্যস্থান দিয়ে চলতে পারে। এগুলো তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দের মতো এগুলোর কোনো বস্তুগত মাধ্যম প্রয়োজন হয় না।
বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মহাজাগতিক সংকেত সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলোকে মানুষের শোনার উপযোগী শব্দে রূপান্তর করা যায়।
শব্দ এবং রেডিও তরঙ্গের পার্থক্য
শব্দ একটি যান্ত্রিক তরঙ্গ। তাই শব্দ চলার জন্য বাতাস, পানি বা অন্য কোনো মাধ্যম দরকার।
অন্যদিকে রেডিও তরঙ্গ তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। তাই এটি শূন্যস্থান দিয়েও চলতে পারে।
এই পার্থক্যটি বুঝলেই মহাকাশের নীরবতার বিষয়টি সহজ হয়ে যায়।
মহাকাশের নীরবতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মহাকাশের নীরবতা আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে সাহায্য করে। শব্দ শুধু তৈরি হলেই আমাদের কানে পৌঁছায় না।
শব্দের চলার জন্য উপযুক্ত মাধ্যমও দরকার। পৃথিবীতে বাতাস সেই কাজটি করে। কিন্তু মহাকাশে সেই মাধ্যম প্রায় অনুপস্থিত।
তাই মহাকাশের নীরবতা কোনো রহস্যময় ঘটনা নয়। এটি শব্দের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ফল।
শেষ কথা
মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না, কারণ শব্দ চলার জন্য একটি মাধ্যম প্রয়োজন। মহাকাশের অধিকাংশ অঞ্চলে সেই মাধ্যম প্রায় নেই।
তবে রেডিও তরঙ্গ মহাকাশে চলতে পারে। তাই আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে নভোচারীরা সহজেই একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন।
মহাকাশের নীরবতা তাই আমাদের মহাবিশ্বের একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
