মহাবিশ্ব কত বড়? কল্পনারও বাইরে এক বিশাল জগৎ
রাতের আকাশের দিকে তাকালে অসংখ্য তারা দেখা যায়। শহরের আলো কম হলে সেই দৃশ্য আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। তখন মনে প্রশ্ন জাগে, এই তারাগুলোর শেষ কোথায়?
আমরা যে আকাশ দেখি, সেটিই কিন্তু পুরো মহাবিশ্ব নয়। বরং এটি বিশাল এক মহাজগতের খুব ছোট একটি অংশ।
তাহলে মহাবিশ্ব কত বড়?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়। কারণ মহাবিশ্বের বিশালতা আমাদের কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়।

মহাবিশ্ব বলতে কী বোঝায়?
সহজ ভাষায়, মহাবিশ্ব হলো সবকিছুর বিশাল সমষ্টি।
এর মধ্যে রয়েছে গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ, চাঁদ, গ্যাস, ধূলিকণা এবং বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু। এছাড়া রয়েছে স্থান, সময় এবং নানা ধরনের শক্তি।
আমাদের পৃথিবী এই বিশাল মহাবিশ্বের একটি অত্যন্ত ছোট অংশ।
পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে। আবার সূর্য আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটি সাধারণ নক্ষত্র।
আর মিল্কিওয়ে নিজেই মহাবিশ্বের অসংখ্য গ্যালাক্সির মধ্যে মাত্র একটি।
মিল্কিওয়ে কত বড়?
মিল্কিওয়ে একটি বিশাল সর্পিল গ্যালাক্সি।
এর মধ্যে শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। আমাদের সূর্যও তাদের মধ্যে একটি।
মিল্কিওয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আলো পৌঁছাতে প্রায় এক লাখ বছর সময় লাগে।
ভাবুন তো, আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। তারপরও একটি গ্যালাক্সি অতিক্রম করতে তার এত সময় লাগে!
এ থেকেই মহাবিশ্বের বিশালতা কিছুটা বোঝা যায়।
আলোকবর্ষ কী?
মহাবিশ্বের দূরত্ব বোঝাতে বিজ্ঞানীরা সাধারণত আলোকবর্ষ ব্যবহার করেন।
আলোকবর্ষ কোনো সময়ের একক নয়। এটি দূরত্বের একক।
এক বছরে আলো যতটা পথ অতিক্রম করে, সেটিই এক আলোকবর্ষ।
আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার গতিতে চলে। ফলে এক আলোকবর্ষের দূরত্ব অকল্পনীয়ভাবে বিশাল।
মহাকাশের দূরত্ব বোঝার জন্য তাই কিলোমিটারের বদলে আলোকবর্ষ ব্যবহার করা অনেক সুবিধাজনক।
দৃশ্যমান মহাবিশ্ব কত বড়?
বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত যে অংশ পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন, তাকে বলা হয় পর্যবেক্ষণযোগ্য বা দৃশ্যমান মহাবিশ্ব।
এর ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ বলে বর্তমান মহাজাগতিক মডেল থেকে অনুমান করা হয়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।
মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। তাহলে এর ব্যাস ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ কীভাবে হয়?
এর কারণ হলো মহাবিশ্ব স্থির নয়। এটি ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।
আলো যখন আমাদের দিকে আসছিল, তখন সেই আলো চলার সময় মহাকাশ নিজেই প্রসারিত হয়েছে। ফলে বর্তমানে সেই দূরত্ব অনেক বেশি।
তাহলে পুরো মহাবিশ্ব কত বড়?
এখানেই সবচেয়ে বড় রহস্য।
আমরা পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের আকার সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। কিন্তু পুরো মহাবিশ্বের প্রকৃত আকার এখনো জানা যায়নি।
এটি পর্যবেক্ষণযোগ্য অংশের চেয়ে অনেক বড় হতে পারে।
এমনকি মহাবিশ্ব অসীমও হতে পারে। আবার এর কোনো নির্দিষ্ট কিন্তু অত্যন্ত বিশাল আকারও থাকতে পারে।
বর্তমান বিজ্ঞান এখনো নিশ্চিতভাবে এর উত্তর দিতে পারেনি।
মহাবিশ্বে কত গ্যালাক্সি আছে?
একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মহাবিশ্বে কয়েক বিলিয়ন গ্যালাক্সি থাকতে পারে।
পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও উন্নত গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আরও অসংখ্য গ্যালাক্সি আবিষ্কার করেছেন।
বর্তমান গবেষণায় পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে শত শত বিলিয়ন থেকে এক ট্রিলিয়নের কাছাকাছি গ্যালাক্সি থাকতে পারে বলে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়।
প্রতিটি গ্যালাক্সিতেই আবার রয়েছে অসংখ্য নক্ষত্র।
অর্থাৎ, আমরা যে রাতের আকাশ দেখি, সেটি আসলে মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র জানালা মাত্র।
মহাবিশ্ব কি প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে?
হ্যাঁ।
মহাবিশ্বের প্রসারণের ধারণা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।
দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে সাধারণত দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের আলোতে এমন পরিবর্তন দেখা যায়, যা মহাবিশ্বের প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, মহাবিশ্বের প্রসারণ ধীরে ধীরে দ্রুততর হচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
এর সঙ্গে ডার্ক এনার্জি নামের একটি রহস্যময় ধারণার সম্পর্ক রয়েছে।
তবে ডার্ক এনার্জি আসলে কী, সেটি এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
আমরা মহাবিশ্বের কতটুকু দেখতে পারি?
এটি ভাবলে বিষয়টি আরও অবাক করার মতো মনে হয়।
আলো একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে। তাই মহাবিশ্বের সব জায়গা থেকে আসা আলো এখনো আমাদের কাছে পৌঁছায়নি।
ফলে এমন অনেক মহাজাগতিক অঞ্চল থাকতে পারে, যেগুলো সম্পর্কে আমরা এখনো কিছুই জানতে পারি না।
কিছু অঞ্চল থেকে আলো হয়তো ভবিষ্যতেও আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না।
কারণ মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে কিছু দূরবর্তী অঞ্চল আমাদের পর্যবেক্ষণের সীমার বাইরে চলে যেতে পারে।
পৃথিবী কোথায় অবস্থান করছে?
এই বিশাল মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের অবস্থান ভাবলে সত্যিই বিস্ময় জাগে।
আমরা পৃথিবীতে বাস করি।
পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ। সৌরজগত রয়েছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে।
মিল্কিওয়ে রয়েছে অসংখ্য গ্যালাক্সির বিশাল সমষ্টির মধ্যে।
আর এই পুরো কাঠামোই রয়েছে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের মধ্যে।
অর্থাৎ, মহাবিশ্বের তুলনায় পৃথিবী সত্যিই এক ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো।
মহাবিশ্বের শেষ কি আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের কাছেও অজানা।
মহাবিশ্বের কোনো প্রান্ত আছে কি না, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
কারণ আমরা যত দূর দেখতে পারি, সেটিই মহাবিশ্বের শেষ নয়।
এটি শুধু আমাদের পর্যবেক্ষণের সীমা।
সম্ভবত ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপ এবং উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের আরও অনেক তথ্য দেবে।
শেষ কথা
মহাবিশ্ব কত বড়?—এর সম্পূর্ণ উত্তর এখনো মানুষের জানা নেই।
আমরা শুধু জানি, পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। এর মধ্যে রয়েছে অগণিত গ্যালাক্সি এবং নক্ষত্র।
তবে পুরো মহাবিশ্ব এর চেয়েও অনেক বড় হতে পারে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিশাল মহাবিশ্বের রহস্য জানার চেষ্টা করছে মানুষ। একটি ছোট গ্রহে বসেই আমরা দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলো বিশ্লেষণ করছি।
তাই মহাবিশ্ব যতই বিশাল হোক, মানুষের জানার আগ্রহ তার চেয়েও বিস্ময়কর।
