ক্ষুধার আড়ালে
শহরের এক জীর্ণ গলির শেষ প্রান্তে একটি চুনকাম খসা দোতলা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তবে, সেই নিভৃতির আড়ালে শান্তি কতটুকু আছে, তা কেউ জানে না। প্রকৃতপক্ষে, পাশের বাড়ির উৎসবমুখর আলোকসজ্জা সেই খবর কোনোদিন জানিতে পারে নাই।
সেই বাড়ির কর্তা হলেন বৃদ্ধ হরিশঙ্করবাবু। এককালে জমিদারি না থাকিলেও জমিদারি মেজাজটুকু তাঁহার রক্তে এখনও রহিয়া গিয়াছে। তাই, সাদা ধবধবে ধুতি আর ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি ছাড়া তিনি বাহিরে এক পা-ও বাড়ান না। কিন্তু, সেই ধবধবে পাঞ্জাবির ঠিক নিচেই জঠর জ্বালা প্রতিমুহূর্তে হাহাকার করিতেছে। মূলত, সেই অভাব ঢাকিতেই তাঁহার সকল বাহ্যিক কারুকার্য।
পূর্ণিমার চাঁদ ও ঝলসানো রুটি
সেদিন আকাশে প্রকাণ্ড পূর্ণিমার চাঁদ ছিল। আকাশের সেই চাঁদখানা যেন একখানা বিশাল রুপার থালা। তখন, হরিশঙ্করবাবু জানালার ধারে বসিয়া সেই চাঁদের দিকে চাহিয়া ভাবিতেছিলেন। তিনি ভাবলেন, “অদ্ভুত এই পৃথিবী!”
যখন ক্ষুধা মানুষের নাড়ি ধরিয়া টান দেয় তখন সব রূপকথা হারিয়ে যায়। ফলস্বরূপ, আকাশের রাজরাজেশ্বরকেও তখন তপ্ত কড়াইয়ের একখানা ঝলসানো রুটি বলিয়া ভ্রম হয়।
অন্নপূর্ণার শূন্য ভাঁড়ার
অপরদিকে, রান্নাঘরে তাঁহার সহধর্মিণী অন্নপূর্ণা তখন শূন্য হাঁড়িটার দিকে চাহিয়া মৌনব্রত পালন করিতেছেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তাঁহার নাম অন্নপূর্ণা হইলেও আজ সেই অন্নপূর্ণার ভাঁড়ার সম্পূর্ণ শূন্য। গত তিন দিন ধরিয়া দুই বেলা শুধু জল আর এক টুকরা গুড় দিয়া সংসার চলিতেছে।
তা সত্ত্বেও, পার্শ্ববর্তী বাড়ির ভোজের আমন্ত্রণে তিনি যান নাই। কারণ, তাঁদের মনে ওই ‘মধ্যবিত্তের আভিজাত্য’ মিশে আছে। ফলে, হাত পাতা যায় না, আবার ক্ষুধাও সহ্য করা যায় না। এটি আসলে এক অদ্ভুত মানসিক ফাঁদ।
মিথ্যার আড়ালে সত্যের দহন
হঠাৎ হরিশঙ্করবাবু রান্নাঘরে আসিয়া দাঁড়ালে অন্নপূর্ণা সজল নেত্রে তাঁহার দিকে চাহিলেন। তখন, হরিশঙ্করবাবু মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “শোনো গো, আজ নাকি অমাবস্যা যাওয়ার পর এই প্রথম পূর্ণিমা? পেটটা বড় ভার ভার লাগিতেছে। তাই ভাবিতেছি, আজ রাতে না খাইয়াই কাটাইয়া দিব।” তিনি আরও যোগ করলেন, উপবাস নাকি স্বাস্থ্যের জন্য বড়ই হিতকর।
তবে, অন্নপূর্ণা জানিতেন এই হাসির আড়ালে কতবড় মিথ্যার পাহাড় রহিয়াছে। সুতরাং, তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু আঁচলে চোখ মুছিয়া এক গ্লাস জল আগাইয়া দিলেন।
ঠিক তখনই, বাহিরে দামী গাড়ির হর্ন আর আতশবাজির শব্দ শোনা গেল। উৎসবের আলোকরশ্মি জানালার ফাঁক দিয়া আসিয়া হরিশঙ্করবাবুর সেই তালি দেওয়া পাঞ্জাবির উপর পড়িল।
উপসংহার: আমাদের দায়বদ্ধতা
সমাজের চোখে ইহারা সুখী এবং সম্ভ্রান্ত। ইহারা দয়া চাহে না, করুণা চাহে না। ইহারা শুধু সমাজ থেকে এক চিলতে সম্মান চাহে। আমাদের চারপাশে এমন অনেক হরিশঙ্কর আর অন্নপূর্ণারা রহিয়াছেন। ইহারা ক্ষুধার জ্বালায় সবার সামনে কাঁদে না। বরং, অপমানের ভয়ে নীরবে তিলে তিলে ক্ষয় হয়। এটিই মূলত মধ্যবিত্তের নীরবতা।
আমরা যখন খাবার অপচয় করি, তখন অনেক ভুল করি। আমরা আমাদের ছোট ছোট অভাব লইয়া বিলাপ করি। কিন্তু, আমরা কি একবারও ভাবিয়া দেখি না? আমাদেরই পাশের জানালার ওপারে কোনো এক মধ্যবিত্ত ঘরে ক্ষুধার্ত হাসি দিয়া কেউ এক বিশাল যুদ্ধ জয় করিতেছে। অতএব, দয়া নয়, সহমর্মিতা আর একটু খোঁজ লওয়াই হয়তো পারে এই নীরব যুদ্ধের অবসান ঘটাইতে।
