রাতের আকাশে তাকালেই আমাদের চোখে পড়ে চাঁদ। কখনো পূর্ণিমার গোল চাঁদ, আবার কখনো সরু এক ফালি চাঁদ। তবে কখনো কি ভেবেছেন, চাঁদ কীভাবে তৈরি হয়েছে? কোটি কোটি বছর আগে চাঁদের জন্ম কীভাবে হয়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন।
চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো বৃহৎ সংঘর্ষ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর সঙ্গে একটি বিশাল মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষ থেকেই চাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল।

পৃথিবীর জন্মের পর কী ঘটেছিল?
বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে তৈরি হয়েছিল। তখন পৃথিবী আজকের মতো শান্ত ও স্থিতিশীল ছিল না। চারদিকে ছিল উত্তপ্ত শিলা, ধূলিকণা এবং বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু।
সেই সময় সৌরজগতও ছিল অনেক বেশি অস্থির। বিভিন্ন গ্রহ ও উপগ্রহ তৈরির প্রক্রিয়া চলছিল। ফলে মহাকাশে বড় বড় বস্তুর সংঘর্ষ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
এরই মধ্যে পৃথিবীর সঙ্গে একটি মঙ্গল গ্রহের মতো আকারের মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষ ঘটে বলে ধারণা করা হয়।
কীভাবে তৈরি হলো চাঁদ?
বিজ্ঞানীরা সেই কাল্পনিক মহাজাগতিক বস্তুর নাম দিয়েছেন থিয়া। ধারণা করা হয়, থিয়া পৃথিবীর সঙ্গে প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করেছিল।
এই সংঘর্ষে পৃথিবীর বাইরের অংশ থেকে বিপুল পরিমাণ গলিত শিলা মহাকাশে ছিটকে যায়। সেই ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে ঘুরতে থাকে।
এরপর ধীরে ধীরে এসব শিলা ও ধূলিকণা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে। মহাকর্ষের কারণে বস্তুগুলো আরও কাছাকাছি আসে।
অবশেষে দীর্ঘ সময় ধরে জমতে জমতে একটি বড় গোলাকার মহাজাগতিক বস্তু তৈরি হয়। সেটিই পরে আমাদের পরিচিত চাঁদে পরিণত হয়।
চাঁদের বয়স কত?
চাঁদ পৃথিবীর চেয়ে খুব বেশি ছোট নয়। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, চাঁদের বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর।
অর্থাৎ পৃথিবীর জন্মের সময়ের কাছাকাছি সময়েই চাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল। তাই পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক মিল পাওয়া যায়।
চাঁদের পাথর পরীক্ষা করেও বিজ্ঞানীরা এর প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। অ্যাপোলো অভিযানের নভোচারীরা চাঁদ থেকে বিভিন্ন শিলা ও মাটির নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলেন।
এসব নমুনা চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চাঁদের সৃষ্টি নিয়ে অন্য ধারণা ছিল
বৃহৎ সংঘর্ষ তত্ত্ব জনপ্রিয় হওয়ার আগে চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে আরও কয়েকটি ধারণা ছিল।
একটি ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবী ও চাঁদ একই সময় একই উপাদান থেকে তৈরি হয়েছিল। আরেকটি ধারণায় বলা হয়েছিল, পৃথিবীর মহাকর্ষ চাঁদকে মহাকাশ থেকে ধরে ফেলেছিল।
তবে এসব ধারণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বর্তমানে বৃহৎ সংঘর্ষ তত্ত্বই সবচেয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলোর একটি।
চাঁদ কেন পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
চাঁদ শুধু রাতের আকাশকে সুন্দর করে না। বরং পৃথিবীর পরিবেশেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
বিশেষ করে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে চাঁদের মহাকর্ষের সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া চাঁদ পৃথিবীর ঘূর্ণন ও অক্ষের স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলে।
তাই চাঁদ ছাড়া পৃথিবীর বর্তমান পরিবেশ অনেকটাই ভিন্ন হতে পারত।
শেষ কথা
চাঁদ কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করছেন। বৃহৎ সংঘর্ষ তত্ত্ব বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলেও চাঁদের জন্মের সব রহস্য এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। পৃথিবীর আকাশে থাকা এই সুন্দর উপগ্রহের জন্ম হয়েছিল মহাজাগতিক এক বিশাল ঘটনার মাধ্যমে।
তাই পরের পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকালে মনে রাখুন। সেই আলো আসলে বহন করে পৃথিবীর প্রায় ৪৫০ কোটি বছরের মহাকাশ ইতিহাস।
