বৃষ্টির মধ্যে যে মানুষটি থামতে পারেন না
ঢাকায় বৃষ্টি নামলে শহরের চেহারা বদলে যায়। কোথাও যানজট, কোথাও জলাবদ্ধতা। অনেকে ছাতা নিয়ে দৌড়ে আশ্রয় খোঁজেন। কেউ অফিসে বসে জানালার কাঁচে জমে থাকা পানির রেখা দেখেন। কিন্তু এই শহরে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জন্য বৃষ্টি মানে কাজ বন্ধ করার সুযোগ নয়।
এমনই একটি দৃশ্য হামেসাই আমাদের চোখে পড়ে, ব্যস্ত সড়কে টানা বৃষ্টি। চারদিকে হর্নের শব্দ, জমে থাকা পানি আর মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের মাঝেই একজন রিকশাচালক ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। তার মলিন জামা ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। তবুও থামার কোনো উপায় নেই।
হয়তো তার মাথায় তখন অন্য হিসাব চলছে।
বাড়িতে আজ চাল আছে তো?
ছোট ছেলেটার স্কুলের বেতন দেওয়া হয়েছে?
বাজার থেকে ফেরার সময় কিছু মাছ নেওয়া যাবে?
আমরা জানি না তার উত্তর কী। তবে এটুকু বোঝা যায়, তিনি শুধু একজন যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন না। তিনি নিজের পরিবারের দায়িত্বও টেনে নিয়ে চলেছেন।
দিন আনে দিন খায়
আমাদের আশপাশে অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয় নির্ভর করে প্রতিদিনের কাজের ওপর। রিকশাচালকদের বড় অংশ সেই দলে পড়েন। সকালে বের হলে আয় আছে। না বের হলে কিছুই নেই।
বৃষ্টি, রোদ কিংবা শীত—সবকিছুর সঙ্গে তাদের সমঝোতা করেই চলতে হয়।
একদিন কাজ না করলে হয়তো খুব বড় ক্ষতি হবে না। কিন্তু টানা কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকলে সংসারের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। বাড়িভাড়া, বাজার, ওষুধ—সবকিছু অপেক্ষা করে না।
এই কারণেই অনেককে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেও রাস্তায় দেখা যায়।
ছবির বাইরেও একটি গল্প থাকে
আমরা যখন কোনো ছবি দেখি, তখন কেবল একটি মুহূর্ত দেখি। কিন্তু সেই মুহূর্তের পেছনে থাকে দীর্ঘ একটি গল্প।
হয়তো এই মানুষটি গ্রামের বাড়ি ছেড়ে বহু বছর আগে ঢাকায় এসেছেন। হয়তো ভালো কাজের আশায় এসেছিলেন। হয়তো সংসারের টানেই রিকশার হ্যান্ডেল ধরতে হয়েছে।
এসব গল্প কেউ জানে না।
শহরের ব্যস্ততা মানুষের ব্যক্তিগত কাহিনি শোনার সময়ও দেয় না।
তবুও প্রতিদিন হাজারো মানুষ নীরবে নিজের দায়িত্ব পালন করে যান।
যারা আলোচনায় আসেন না
আমরা প্রায়ই সফল মানুষের গল্প শুনি। তাদের অর্জনের কথা পড়ি। কিন্তু এই শহরের সবচেয়ে কঠিন পরিশ্রম করা মানুষগুলোর কথা খুব কম বলা হয়।
রিকশাচালক, দিনমজুর, ভ্যানচালক কিংবা নির্মাণশ্রমিক—তাদের ঘামেই শহরের অনেক কাজ এগিয়ে চলে।
তাদের জীবন সহজ নয়। তবুও তারা প্রতিদিন নতুন করে শুরু করেন।
এই দৃশ্য তাই কেবল একটি বৃষ্টিভেজা রাস্তার ছবি নয়। এটি আমাদের সমাজের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
বৃষ্টি থেমে যাবে। রাস্তার পানি শুকিয়ে যাবে। কিন্তু অনেক মানুষের সংগ্রাম পরদিন আবারও একইভাবে শুরু হবে।
সম্ভবত এটাই জীবনের সবচেয়ে কঠিন, আবার সবচেয়ে সুন্দর দিক—অসংখ্য বাধার মধ্যেও মানুষ আশা ছাড়ে না।
