বাংলার নৌকা। শেকড় থেকে ঐতিহ্যের গল্প

ভূমিকা:

বাংলার নদীমাতৃক জনপদে নৌকা ছিল একসময় মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীনকাল থেকে যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য, মাছ ধরা এবং রাজকীয় ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন ধরনের জলযান ব্যবহৃত হতো। বজরা, ময়ূরপঙ্খী, পানসি, সাম্পান, ডিঙ্গি ও বাইচের নৌকার মতো অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। সময়ের পরিবর্তনে অনেক নৌকা আজ হারিয়ে গেলেও, এগুলো আমাদের অতীত ঐতিহ্য ও নদীকেন্দ্রিক জীবনধারার স্মারক হয়ে আছে।

নিন্মে নৌকাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো –

 

 

বজরা নৌকা

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বজরা নৌকা: আগের দিনে বাংলার জমিদার এবং বিত্তশালীদের নৌ-ভ্রমণের শখের বাহন ছিল বজরা। এতে খাবার-দাবার ঘুমানোসহ নানা সুবিধা থাকত। কোনোটাতে পালও লাগানো হতো। এতে ৪ জন করে মাঝি থাকত। যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নতির কারণে বহু আগে এই নৌকার কদর কমেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের পছন্দের নৌকা ছিল বজরা, এই নৌকাতেই দিনের পর দিন পদ্মা নদীতে স্ত্রীর সঙ্গে ভেসে বেড়াতেন, এই নৌকাতে বসেই লিখেছেন বহু গান কবিতা…

   ময়ূরপঙ্খী নৌকা: রাজা-বাদশাহদের শৌখিন নৌকা ছিল ময়ূরপঙ্খী। সামনের অংশ ময়ূরের আকৃতির মতো হওয়ায় এর এমন নামকরণ। এটি চালানোর জন্য সাধারণত চারজন মাঝির প্রয়োজন হতো এবং এতে দুটি পাল থাকতো।মূলত উন্নত মানের কাঠ দিয়ে তৈরি এবং বিভিন্ন কারুকার্য ও রঙে এটি সাজানো হতো।দৃষ্টিনন্দন এই এটি প্রাচীন বাংলায় আভিজাত্য ও রাজকীয় বিলাসিতার প্রতীক ছিল।নৌকাটি আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

পালতোলা পানসি নৌকা: নৌ-ভ্রমণে দূরে কোথাও যাওয়ার একমাত্র ও অন্যতম মাধ্যম ছিল পালতোলা পানসি। সম্রাট আকবরের আমলে এ নৌকায় করে জমিদাররা বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য করতে যেতেন। বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলে এটি প্রচুর দেখা যেতো। গ্রামগঞ্জের নৌপথে চলাচলে ইঞ্জিনচালিত নৌকা এর স্থান দখল করে নেয়ায় এর চাহিদা এখন আর নেই।

সওদাগরী নৌকা: ব্যবসায়ীরা দূরদেশে পণ্য নিয়ে যাতায়াতের জন্য সওদাগরী নৌকা ব্যবহার করতেন। বড় ধারণক্ষমতা ও পালযুক্ত এই নৌকা একসময় বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল। বর্তমানে এটি বিলুপ্ত।

 

গয়না নৌকা: কোন কোন এলাকায় খেয়া নৌকা বলা হয়। মাঝারি বা বড় আকারের গয়না নৌকা যাত্রী পারাপারের কাজে ব্যবহৃত হতো। বাঁশের ছাউনি দেওয়া এই নৌকায় একসঙ্গে অনেক যাত্রী বহন করা যেত।বর্তমানে এই নৌকাও বিলুপ্তির পথে।

বালার নৌকা: কুষ্টিয়া অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বড় আকারের নৌকা ছিল বালার। ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে এটি ব্যবহৃত হতো। একাধিক মাঝি ও পালসহ এই নৌকা নদীপথে চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ বাহন ছিল।

সাম্পান নৌকা: বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নৌকাগুলোর মধ্যে সাম্পান অন্যতম পরিচিত। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কুতুবদিয়া অঞ্চলে এই নৌকা বেশি দেখা যেত। সামনের দিক উঁচু ও বাঁকানো, পিছনের দিক সোজা হওয়ায় এটি সহজেই চেনা যায়। সমুদ্রের ঢেউ সামলে চলতে সক্ষম এই নৌকা একসময় মালামাল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। বড় সাম্পানে একাধিক মাঝি ও ত্রিভুজাকৃতির পালও থাকত। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে

ডোঙা নৌকা: তালগাছের কাণ্ড কুঁদে এ নৌকা বানানো হয়। একে তালের নাও-কোন্দা নামে পরিচিত। ডোঙ্গা বেশ টেকসই। তাল গাছের কাণ্ড সহজে পঁচে না বলে ডোঙা বেশ কয়েক বছর ব্যবহার করা যায়।

বাইচের নৌকা: নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার জন্য ব্যবহৃত লম্বা ও দ্রুতগামী নৌকা হলো বাইচের নৌকা। বর্ষাকালে এ প্রতিযোগিতা এখনো জনপ্রিয়। অনেক মাঝি একসঙ্গে বৈঠা চালিয়ে নৌকাটি এগিয়ে নেয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকাবাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতিরই একটি অংশ।নৌকা বাইচকে উৎসাহ প্রদান ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার লক্ষে এখণও প্রতি বছর বাংলাদেশে জাতীয় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

উপসংহারঃ

  পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের নদী ও নৌকা একে অপরের পরিপূরক। শত শত বছর ধরে আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ডিঙি, কোষা, বজরা থেকে শুরু করে সাম্পান বা ময়ূরপঙ্খীর মতো ৫০টিরও বেশি বৈচিত্র্যময় নৌকা এদেশের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। কালের বিবর্তনে আধুনিক যান্ত্রিক নৌযানের ভিড়ে অনেক ঐতিহ্যবাহী নৌকা আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে আমাদের শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখতে এবং নদীমাতৃক বাংলার এই অনন্য রূপকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে এই লোকজ ঐতিহ্যগুলোকে সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি। নদী টিকে থাকলে যেমন বাংলাদেশ টিকে থাকবে, তেমনি আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী নৌকাগুলোও বেঁচে থাকবে বাঙালির গৌরবের প্রতীক হিসেবে।

 

Leave a Reply

Scroll to Top

Discover more from BR Creatives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading