“কখনো কখনো এক কাপ চা আর একটি বেঞ্চই যথেষ্ট হয়, দু’টি অজানা মন আবার কথা বলা শুরু করতে।”
লেকটা খুবই পুরোনো, পানি সবুজাভ,শেওলায় ভর্তি, তিনপাশে পচা পাতা, ছোট ছোট ঘাসে ভর্তি। রাস্তার পাশের এই সাইডটাই শুধু পরিস্কার, লোকজনের আনাগোনা। মাঝেমধ্যে কাউকে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায়, কেউ শুধু বসে থাকে। কিন্তু আজকের বিকেলটা একটু আলাদা।
একটা কাঠের বেঞ্চ, পুরনো হলেও এখনো মজবুত। বেঞ্চে বসে আছে একজন বৃদ্ধ, বয়স সত্তরের কাছাকাছি হবে। ধূসর পাঞ্জাবি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। পাশে রাখা একটা চায়ের কাপ, তাতে ধোঁয়া নেই, তবু তিনি তাকিয়ে আছেন কাপটার দিকেই— যেন সেখানেই কোনো গল্প লুকানো, কাপটা কিছু বলছে তাকে।
একটু পরে, আরেকজন আসলো। মাঝবয়সী মহিলা, সাদা শাড়ী, মাথায় গলায় ওড়না পেচানো। চুলে সামান্য পাক ধরেছে, কিন্তু মুখে সেই শান্ত সৌন্দর্য—যেটা বয়সের সাথে মানিয়ে গেছে।
— আপনি প্রতিদিন আসেন? মহিলাটির প্রশ্নে বৃদ্ধ একটু চমকে তাকাল।
— হুম… বেশির ভাগ দিনই, আপনি?
— আজ প্রথম।
বৃদ্ধ মুচকি হাসলেন।
— আজ প্রথম এলেন, অথচ ঠিক আমার প্রিয় বেঞ্চটায় এসে বসলেন।
মহিলা একটু হেসে বললেন,
— দুঃখিত, আপনি চাইলে আমি উঠে যাই।
— না না, থাকুন। দু’জনের বসার জায়গা তো আছে।
তারপর খানিকক্ষণ নীরবতা।
পেছনে কচুরিপানা নড়ছে, পাশের গাছে কাক ডাকছে, আর দূরে একটা ছেলে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে।
— এই জায়গাটা শান্ত, খুবই নিরিবিলি, তাই আপনার পাশে এসে বসলাম— মহিলা বলল।
— হ্যাঁ, এই শান্ত জায়গাটাতেই আমার স্ত্রীকে নিয়ে শেষবার এসেছিলাম,দশ বছর আগে। সে এখানে বসে থাকতে খুবই পছন্দ করত, যেখানে এখন আপনি বসে আছেন। আর আমি উঠে গিয়ে চা আনতাম, এখনো আনি… তবে এক কাপ।
মহিলা কিছুক্ষণ চুপ থাকল, তারপর ধীরে বললেন,
— আমিও আমার স্বামীকে হারিয়েছি, চার বছর হলো। সেও প্রকৃতি পছন্দ করত। সুযোগ পেলেই আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তো।
দুজনেই চুপ, সুনসান নিরবতা
শুধু পাশের গাছে বাতাসে শুকনো পাতার খসখসানি। সময় থেমে গেছে বলে মনে হয়।
শেষ বিকেলের আলো পুকুরের সবুজ জলে প্রতিফলিত হচ্ছে। যেন পৃথিবীর সব ক্লান্তি এখানে এসে একটু বসে নিঃশ্বাস নেয়।
বৃদ্ধ কাপটা হাতে তুলে বলল,
— আপনি চাইলে কাল আবার দেখা হতে পারে। আমি ঠিক এই সময়, এই বেঞ্চেই থাকবো।
মহিলা একটু হেসে মাথা নাড়ল।
— আমি কাল আসবো, এক কাপ চা আমার জন্যও আনবেন তো?
বৃদ্ধ চোখ মুছলেন চুপচাপ, হয়তো বাতাসের ধুলো পড়েছে চোখে, হয়তো নয়।



